চলে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। ‘সুতরাং’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বউ’ ও ‘তিতাস একটি নদীর নাম’র মতো সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা রেখে গেলেন স্মৃতিটুকুই। বাংলা সিনেমার ভক্তরা হারাল তাদের ‘মিষ্টি মেয়ে’খ্যাত অভিনেত্রী কবরীকে।
গতকাল শুক্রবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ফারুক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা আক্রান্তের পাশাপাশি কবরীর কিডনির জটিলতা, শারীরিক দুর্বলতাসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত সমস্যা ছিল।
কিংবদন্তি অভিনেত্রী, নির্মাতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরীর মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, কবরী ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে তার অবদান মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। রাষ্ট্রপতি মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শোকবার্তায় বলেন, এদেশের চলচ্চিত্রে কবরী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতি ও সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
কবরীর ছেলে শাকের চিশতী গতকাল রাতে জানিয়েছেন, পারিবারিকভাবে আলোচনা করে দাফন ও জানাজার সময়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত ৫ এপ্রিল করোনাভাইরাস রিপোর্ট ‘পজিটিভ’ আসার পর রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কবরীকে। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৮ এপ্রিল শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয় তাকে। এরপর অবস্থার আরও অবনতি হলে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কবরীকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে (লাইফ সাপোর্ট) নেওয়া হয়।
১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। ১৯৬৫ সালে অভিনয় করেন ‘জলছবি’ ও ‘বাহানা’য়, ১৯৬৮ সালে ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’। ১৯৭০ সালে ‘দীপ নেভে নাই’, ‘দর্পচূর্ণ, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্রে। এসব সিনেমার মাধ্যমে পেয়ে যান তারকাখ্যাতি। দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘সুজন সখী’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘সারেং বউ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’সহ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।
অভিনেত্রী কবরী একাত্তরে কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন; সেখানে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন; সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন। পরে দেশে ফিরে চলচ্চিত্রে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ২০০৬ সালে ‘আয়না’ নামে একটি চলচ্চিত্রের পরিচালনার মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক ঘটে কবরীর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকারি অনুদানে ‘এই তুমি সেই তুমি’ নামে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন তিনি। সিনেমাটির এখনো নির্মাণ শেষ হয়নি।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কবরী। ২০১৭ সালে বিপিএল থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার লেখা স্মৃতিচারণমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’।
১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্ম মিনা পালের (কবরীর পূর্ব নাম)। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারে। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ‘মিনা পাল’ থেকে কবরী নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরী পাঁচ সন্তানের মা।