দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ করোনা পরিস্থিতির এক বছর পার করল। এই এক বছরে দেশের অর্থনীতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : প্রথমত, করোনা সংক্রমণের সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বাংলাদেশে ততটুকু হতে দেওয়া হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে সরকারের নেতৃত্বে এবং সবার প্রচেষ্টায়। দ্বিতীয়ত, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছিল, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক তারাই এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইতিবাচক কথা বলছে। তারা বলছে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমান বছরে ২.৫ থেকে ৫.৫ হতে পারে। আইএমএফ বলছে ৫ ভাগ হতে পারে। এডিবি বলছে ৬ ভাগের বেশি হবে। কাজেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল আছে এটা পরিষ্কার। সরকার করোনার সময়ে যখনই কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে, মিল-কারখানা খোলা রাখছে। এতে একটা বৈষম্য হচ্ছে। এখানে লাভ হয়েছে সমাজের বিত্তবান শ্রেণির। যারা দিন আনে দিন খায়, অনানুষ্ঠানিক নানা খাতে কাজ করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র পর্যায়ের শিল্প খাতের লোকজন ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। এমনিতেই বৈষম্য আছে, এইসব ঘটনায় বৈষম্যের ব্যবধান আরও বাড়ছে।
দেশ রূপান্তর : করোনার সময়ে সরকার বেশ কিছু প্রণোদনার উদ্যোগ নিয়েছিল। সেগুলো কতটা ফলপ্রসূ হলো?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : প্রথমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেন। এরপরে ২৬ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা পাওয়া গেল। কিন্তু দেখা গেল, ব্যাংকিং সিস্টেমের কারণে যারা বড় বড় ঋণ গ্রহীতা তারাই এ সুযোগ ভোগ করেছে। বিশেষ করে, খেলাপিরা অনেক চতুর। তারা নিজেদের অংশ ঠিকই তুলে নিয়েছে ব্যাংক থেকে। অনেকে সেটা কাজেও লাগিয়েছে। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চায় না। এটা এক ধরনের অপূর্ণতা। আমি মনে করি, এদের জন্য বিসিক বা পিকেএসএফ-কে কাজে লাগানো যেতে পারে। এরা কাজ করলে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ঋণ সহায়তার কাজ করা সহজ হতো। এছাড়া একটি বিশেষ ফান্ড করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে এদের কাজ চলবে। এক্ষেত্রে এমন নীতি থাকবে যে, ৩ বছর বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসায় লোকসান হলে আর ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। বর্তমানে ৩৬ লাখ পরিবারকে সরকারি যে অর্থ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়নের আগেই কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, গত বছর যে ৫০ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে কিন্তু ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কেউ যদি বুঝিয়ে থাকে যে, সেখানে দুর্নীতি কম হয়েছিল তবে তারা দেশের ক্ষতি করছে। এই যে, করোনার সময়ে ৬-৭ ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে কেবল ১০ টাকা কেজি চাল ছাড়া আর কোনোটাই পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। গৃহহীনদের ঘর দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন, সেটি দিয়ে যেই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেখানে বিরাট গলদ রয়ে গেছে। ঘরগুলো ভেঙে পড়ছে। নিম্নমানের বানানো হয়েছে। কাজেই এসব কাজে সহায়তা করার জন্য, তার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য লোক নিতে হবে। নইলে কিন্তু এসব ব্যর্থ হয়ে যাবে।
দেশ রূপান্তর : চলমান লকডাউনের মাঝে ‘জীবন নাকি জীবিকা’ এমন একটি কথা জনসাধারণের মাঝে খুব আলোচিত হচ্ছে।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : জীবন এবং জীবিকা এ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারও এ বিষয়টি অনুধাবন করে বলে আমার মনে হয়। তবে মনে রাখতে হবে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য যদি স্বল্প মেয়াদে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয় তবে সেটাই শ্রেয়। এই যে বলা হচ্ছে কঠোর লকডাউন, কার্যত তা ভেঙে পড়ছে। তার ওপর আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে মুভমেন্ট পাস। এটির কোনো দরকারই ছিল না। এর ফলে বহু লোক বিনা প্রয়োজনে মুভমেন্ট পাসের দোহাই দিয়ে বাইরে বের হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে আরও এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ এই জনবহুল দেশে কারফিউ জারি করতে হবে। কারফিউর কোনো বিকল্প নেই। সম্প্রতি, দেশ রূপান্তরের একটি নিউজে দেখলাম রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৩০০ গুণ। আমার হিসাবে যদিও সাড়ে ৩০০ হবে। শয্যাসংখ্যা প্রকৃতপক্ষে কমেছে। বেড়েছে কিছু অক্সিজেন সুবিধা। এই যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, কাজ ফেলে রাখা, সমন্বয়হীনতা, ড্রাইভার থেকে শুরু করে বড় সাহেব পর্যন্ত অনেকেই আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, সেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। বাংলাদেশ যে ১৩০টি দেশের টিকা পাওয়ার আগেই করোনার ভ্যাকসিন পেয়ে গেল, এটাও প্রধানমন্ত্রীর জন্য সম্ভব হয়েছে। তবে এই টিকার কেনাকাটা সরকার টু সরকার হলে ভালো হতো। চীন এবং রাশিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। এছাড়া আমাদের দেশে যে সব ওষুধ কোম্পানি ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছিল, তাদের আরও উৎসাহ দিয়ে নিজেদের টিকা বানানোতে মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল।
দেশ রূপান্তর : করোনার সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে। এতে বেকারত্ব বেড়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এখন কথা হচ্ছে, যদি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা না থাকে তবে কীভাবে কর্মীদের বেতন দেবে! তাই তারা কর্মী ছাঁটাই করছে। তবে এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে, যেটি আগে উল্লেখ করেছি অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। বিসিককে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগও রয়েছে এ বিষয়ে। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতি এড়িয়ে টিকে থাকতে পারবে। তখন আর কর্মী ছাঁটাই করতে হবে না।
দেশ রূপান্তর : বিশ্বপরিস্থিতি ও অন্যান্য পরিসংখ্যান থেকে মনে হচ্ছে করোনা সংকট শিগগিরই কাটছে না। এ অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা কীভাবে চলবে?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, আমাদের অর্থনীতি কিন্তু ভেঙে পড়েনি। করোনার সময়ে ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে ভারতের জিডিপি বাড়বে ১২ ভাগের বেশি। চীনের বাড়বে ৮-৯ ভাগ। ভিয়েতনামের বাড়বে ৮-৯ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপেও প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছে। এগুলো কিন্তু বাংলাদেশের জন্যই ভালো খবর। এতে করে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা কিন্তু বাড়বে। বাংলাদেশি কর্মীরা বিদেশে যেতে পারবে। এতে করে দেশে বিদেশ থেকে অর্থ আসবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে। তাতে করে চলমান উন্নতি অব্যাহত থাকবে। তবে এক্ষেত্রে, অন্য একটি বিষয় বলতে চাই, আমাকে যেটি পীড়া দেয়। গত বছর এই দিনে করোনার বিস্তারের সময়ে আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে করোনার সচেতনতায় নানা কার্যক্রম চোখে পড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের তারকারা করোনার সচেতনতা নিয়ে কথা বলতেন। এইবার এটি একবারেই হচ্ছে না। এটি আবারও চালু করতে হবে। সমাজের ও দেশের যারা গুরুত্বপূর্ণ লোক যাদের কথা লোকজন আমল করে তাদের প্রচারণার কাজে নিয়োজিত করতে হবে। শুধু ওষুধে করোনা কমবে না। টিকা দিয়ে করোনা দমানো যাবে না। পাশাপাশি জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক হারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এছাড়া করোনাকালীন অর্থনীতি নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোকে আরও নিরপেক্ষ ও অর্থবহ করতে হবে। যাতে করে সঠিক লোকের কাছে সরকারের সহায়তা পৌঁছে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এর আগে আমরা দেখেছি প্রণোদনার অর্থ বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের সাজা দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। এবার যে ৩৬ লাখ পরিবারকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বৃদ্ধি করে ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে। তা করার আগে তালিকাটি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। সামনে ঈদের আগে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা হিসেবে এটি নিয়ম মেনে বাস্তবায়ন করা গেলে সফলতা আসবে। মোটকথা বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। তাহলে জীবনমান ঠিক রাখা সম্ভব হবে।
দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক নানা সূচক বলছে, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমরা ভালো করছি। উচ্চ প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতি হয়েছে। এটি সামগ্রিকভাবে কতটুকু প্রভাব রাখছে বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এগুলো খুব একটা প্রভাব রাখছে না। যা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক কৃতিত্ব। নারীর ক্ষমতায়নে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ২০১৭-তে বলেছিল বাংলাদেশ ফিলিপাইনের পরে এশিয়ায় ২য়। তখন স্কোর ছিল ৪৭। ২০১৮-তে গিয়ে নম্বর হলো ৫০। ২০১৯ সেটি হয়ে গেল ৫৫। ২০২০-এ সেটি নেমে গেল ৬৫। আমাদের বর্তমানে নারীর ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা হলেও সামগ্রিকভাবে তো পিছিয়েছে। নানা পর্যায়ে বৈষম্য রয়েছে। এটি কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য বঙ্গবন্ধু যেটি বলেছিলেন, গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি সমবায় গড়তে হবে। এ জন্য অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের কোনো বিকল্প নেই। এটি না হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব বেড়ে যাবে। এবারই যেটি আমরা দেখলাম, মিল-কারাখানার মালিকরা সরকারকে একধরনের চ্যালেঞ্জ দিয়ে রেখেছে। আমরা দেখছি, দেশে চাল ও গমের মজুদ কমেছে। তাই সরকারকে আপৎকালীন পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৯৯৮ সালে সরকারের কাছে ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুদ ছিল সে হিসেবে এবার ২৫ লাখ মেট্রিক টন থাকার কথা। এটি করতে পারলে দেশের সবার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।
দেশ রূপান্তর : গত এক বছরের করোনা পরিস্থিতি এবং বর্তমানের অভিজ্ঞতায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে আপনার কোনো পরামর্শ কি?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : আমার পরামর্শ হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করতে হবে। যাতে করে তেলা মাথায় তেল দেওয়া না হয়। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বিশেষ করে, নারীরা যাতে বিনা হেনস্তায় ঋণ পায়। আমেরিকা ও চীনে কর্মসংস্থাপনের ৬৩ ভাগ করে থাকে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। তাই এ খাতে আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে। এখানে কর্মসংস্থাপনের সৃষ্টি করতে পারলে বৈষম্য কমবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতিশীল থাকবে। এছাড়া আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রকল্প প্রণয়নে দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। তবেই টেকসই অর্থনীতি গড়ে উঠবে।
দেশ রূপান্তর : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।