কলাগাছের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পূরবী বসু তার রচিত ‘কিংবদন্তির খনা ও খনার বচন’ বইয়ের শুরুতে কয়েকটি প্রশ্ন করেন সেগুলো হলো ১. বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি কে? ২. বাংলার প্রথম নারী কৃষিবিদ কে? ৩. বাংলার প্রথম জ্যোতিষবিদ ও গণিতবিদ কে? ৪. বাংলার প্রথম নারী পরিবেশবিদ কে? এই সব প্রশ্নের উত্তর একটাই, তা হলো ক্ষণা বা খনা ওরফে লীলাবতী। সেই খনার বচন এখনো আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে। কথিত আছে, খনা ছিলেন ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জ্যোতিষশাস্ত্রে নিপুণা ও বচন রচয়িতা বিদূষী নারী। তার ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়েও আছে দ্বিমত। একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি বাস করতেন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে। পিতার নাম অটনাচার্য। ‘আমি অটনাচার্যের বেটি, গণতে গাঁথতে কারে বা আঁটি।’ এই বচনের ভেতরে তার বাবার নাম জানা যায়। চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরে তিনি বহুকাল বাস করেন।

অপর কিংবদন্তি অনুসারে, তিনি ছিলেন সিংহলরাজের কন্যা। শুভক্ষণে জন্মলাভ করায় তার নাম রাখা হয় ক্ষণা বা খনা। এদিকে বিক্রমাদিত্যের সভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহপুত্র মিহিরের জন্মের পর গণনা করে দেখেন যে, তার আয়ু মাত্র এক বছর। তাই পুত্রকে তিনি একটি পাত্রে রেখে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌঁছায়। সিংহলরাজ শিশুটিকে নিয়ে লালন-পালন করেন এবং বয়ঃক্রমকালে খনার সঙ্গে তার বিবাহ দেন। মিহির ও খনা উভয়েই জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। অতঃপর মিহির সস্ত্রীক জন্মভূমিতে ফিরে পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পরে তারা একত্রে বসবাস করতে থাকেন। খনার স্বামী মিহির এক সময় বিক্রমাদিত্যের সভাসদ হন এবং পিতার মতো জ্যোতিষশাস্ত্রে প্রতিপত্তি লাভ করেন। একদিন পিতা-পুত্র আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পড়েন। খনা এ সমস্যার সমাধান করে বিক্রমাদিত্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এতে রাজসভায় প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে পিতার আদেশে মিহির খনার জিহ্বা কেটে দেন। কিছুকাল পরে খনার মৃত্যু হয়।

সরকারি ও বেসরকারিভাবে মেহেরপুরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বরাহ, মিহির ও খনা তাদের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় মেহেরপুরে বাস করেন। মিহিরের নামানুসারে এই এলাকার নাম ছিল মিহিরপুর যা পরে রূপান্তরের ফলে মেহেরপুর হয়েছে।খনা মূলত ছড়া বা বচনাকারে বাংলার লোকজীবন সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। যা খনার বচন নামে পরিচিত। যা এক বিশেষ ধরনের লোকশাস্ত্রের জন্ম দেয়। কৃষিপ্রধান দেশের সাধারণ মানুষকে কৃষি, স্বাস্থ্য, আবহাওয়া, পশুপালন, পরিবেশ, গৃহনির্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে উপদেশ ও ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করে। অনেকগুলোই  বৈজ্ঞানিক সত্যের খুব কাছাকাছি। খনার উপদেশবাণী দীর্ঘকাল বাংলাসহ এই উপমহাদেশের আবহাওয়া ও কৃষিকাজের দিকদর্শন হিসেবে কাজ করেছে। খনার আমলে ধান ও কলাকে সোনা-রুপার চাইতেও মূল্যবান মনে করা হতো। তিনি বলেন ‘ধান ধন বড় ধন, আর ধন নাই, সোনা রুপা কিছু কিছু আর সব ছাই’। আবার তিনিই বলেন ‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’।

বাংলাদেশের নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, যশোর, বরিশাল, বগুড়া, রংপুর, জয়পুরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, প্রভৃতি এলাকায় শত শত বছর যাবৎ ব্যাপকভাবে কলার চাষ হয়ে আসছে। এখন কলাগাছ আর ফেলনা নয়। শুধু কলা উৎপাদন না, এ গাছের ডোঙা ও ডাঁটা থেকে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান আঁশ। সেই আঁশ থেকে তৈরি সুতা রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। কলা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ফল। তবে উষ্ণ জলবায়ু সম্পন্ন দেশগুলোয় কলা ভালো জন্মায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কলার উৎপত্তিস্থল বলে গণ্য করা হয়। আমাদের দেশে কলাগাছ থেকে সারা বছর ভালো ফলন পাওয়া যায়। সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবেও বর্তমানে কলার উৎপাদন বেড়েছে। কলাগাছের বিকল্প কোনো ব্যবহার না থাকার কারণে কলার ছড়া কাটার পর কলাগাছও কেটে ফেলা হতো। তবে বর্তমান সময়ে পরিত্যক্ত কলার বাকল থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ভালোমানের ফাইবার বা সুতা। একটি কলাগাছের বাকল থেকে কম করে হলেও দুইশ গ্রাম সুতা উৎপাদন করা যায়।

একটি নামের বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যেই খাগড়াছড়িতে কলাগাছ থেকে সুতা  তৈরির প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, মিঠাপুকুর, যশোর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও সদরসহ দেশের সাত স্থানে কলাগাছ থেকে সুতা উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে ২০০৬ সালে কলাগাছের আঁশ নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয়। প্রকল্পটি প্রথমে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় কাজ শুরু হলেও পরে এটি নিয়ে আসা হয় ময়মনসিংহ শহরে। গবেষণার জন্য দরকারি যন্ত্রপাতি রফিকুল ইসলাম নামের একজন বাংলাদেশি নিজেই তৈরি করে নিয়েছিলেন। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি এ আঁশ থেকে কাপড় তৈরিতে সাফল্য পেয়েছিলেন।

বিশেষ প্রক্রিয়ায় যন্ত্রের সাহায্যে বাকল থেকে আঁশ বের করে এনে, সেই আঁশ পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় তুলার রোল। এরপর স্পিনিং মেশিনে দিয়ে তৈরি করা হয় সুতা। সেই সুতাতেই তাঁতের সাহায্যে কাপড় তৈরি করা হয়। কয়েকটি কানাডীয় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে এই সুতায় তৈরি পোশাক কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। কাপড়ের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য মধুপুরে অত্যাধুনিক স্পিনিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। মান সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলে কানাডাসহ আরও বেশকিছু দেশে এই কাপড় রপ্তানি শুরু করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ফলে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দরজা আমাদের সামনেই।

কলাগাছের বাকল থেকে তৈরিকৃত সুতা টেকসই ও মানসম্পন্ন। জুট বা কটনের সঙ্গে মিশ্রণের পরে এটি আরও টেকসই হয়। কলার বাকল থেকে প্রাপ্ত সুতা জুট বা কটনের সঙ্গে মিশ্রণে পেপার, হ্যান্ডি ক্রাফট, হ্যান্ডব্যাগসহ নানা পণ্য তৈরি করা যায়। এছাড়াও কলার বাকল থেকে ফাইবার অংশ সংরক্ষণের পর অবশিষ্ট অংশ থেকে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন করা যায়। প্রতি কেজি ভার্মি কম্পোস্ট সারের মূল্য প্রায় বিশ টাকা। একটি কলাগাছের বাকল থেকে কম করে হলেও দুইশ গ্রাম সুতা পাওয়া যায়। অর্থাৎ পাঁচটি কলাগাছের বাকল থেকে অন্তত এক কেজি সুতা পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য একশ ত্রিশ টাকা। প্রতিটি কলাগাছ পনের টাকা দামে কেনা যায়। তবে দূর থেকে কলাগাছ কিনতে গেলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। প্রতি কেজি ফাইবার বা সুতা উৎপাদনে একজন শ্রমিক তের টাকা পান। একজন শ্রমিক  দৈনিক সর্বোচ্চ পঞ্চাশ কেজি পর্যন্ত সুতা উৎপাদন করতে পারেন। শ্রমিকদের মতে লোডশেডিং-এর তারতম্যের কারণে মাঝেমধ্যে উৎপাদন কমে যায়।

কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি করার কারণগুলো হচ্ছে কলাগাছের কাঁচামাল সহজলভ্য, অল্প খরচে কলাকাছের বাকল থেকে সুতা তৈরি করা সম্ভব, শ্রমিক মূল্য তুলনামূলকভাবে কম, কম দামে উৎকৃষ্ট মানের পণ্য সরবরাহ করা যায়, কলাগাছের ছাল থেকে কাপড় বানানোর তন্তু, দড়ি, শৌখিন জিনিসপত্র এবং তাঁবু বানানোর জন্য উৎকৃষ্ট মানের সুতা বানানো যায়, প্রাকৃতিক তন্তুর মধ্যে কলাগাছ থেকে প্রাপ্ত তন্তু সবচেয়ে শক্ত, কলাগাছের আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং ত্যাগ করার ক্ষমতা অনেক বেশি, কৃত্রিম তন্তুর বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার করা যায়। সর্বোপরি এটা পরিবেশবান্ধব। কলা থেকে উৎপাদিত এ আঁশ কিনছে ঢাকার ওয়াস্ট অ্যাগ্রো নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান থেকে জানা যায়, কলা গাছের ডোঙা ও ডাঁটা থেকে উৎপাদিত আঁশের তৈরি সুতার চাহিদা অনেক বেশি। এই সুতা দিয়ে দামি শাড়ি-কাপড় তৈরি করা হচ্ছে। এ সুতা ভারত হয়ে চীন, জাপান ও জার্মানি পর্যন্ত যাচ্ছে। দেশে তৈরি একটি মেশিনে আট ঘণ্টায় মোট উৎপাদন করা যায় চল্লিশ কেজি আঁশ। এই প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে দিনাজপুরে এই মেশিন তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি মেশিনের দাম পড়বে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে অদূর ভবিষ্যতে এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। কেননা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশেও কলাগাছের তৈরি সুতার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

খনার বচনের কথা মনে পড়ে যায়, শুধু কলা চাষ করেই আমরা আমাদের ভাত ও কাপড়ের জোগাড় করতে পারি। করোনাকালীন চাকরি হারানো মানুষ আজ নিঃস্ব, অসহায়, তাদের অনেকেই ভেবে পাচ্ছেন না কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন, চালাবেন সংসার। তাদের জন্য হতে পারে এক নতুন চিন্তার খোরাক। দেশীয় প্রযুক্তি ও দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তারা হতে পারেন উদ্যোক্তা, ঘুরিয়ে দিতে পারেন বাংলাদেশের অর্থনীতি।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

liplisa7@gmail.com