করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের সরকার সে দেশের সঙ্গে বিমান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করার ফলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক নতুন করে গুরুতর সমস্যায় পড়েছেন। চলমান করোনা মহামারীকালে জাতীয় অর্থনীতি যখন বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে, তখন এটি একটি বড় দুঃসংবাদ। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকের গন্তব্য সৌদি আরব। প্রবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। এমন অবস্থায় যেসব শ্রমিক সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন, তারা নানা ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দেশ রূপান্তরে শনিবারে প্রকাশিত খবরে জানা যায়।
এমতাবস্থায়, প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রথম দিনের উদ্যোগটিই হোঁচট খেল। ১২টি এয়ারলাইনসের ১৪ বিশেষ ফ্লাইটের সাতটিই বাতিল করা হয়েছে। এয়ারলাইনসগুলোর দাবি, সৌদি আরবের অনুমতি না দেওয়া এবং কাক্সিক্ষত যাত্রী না আসায় এসব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী শ্রমিকরা বলছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গাফিলতিতেই এই ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ফ্লাইট বাতিলের খবরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিক্ষোভ করেছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া শ্রমিকের বেকার হওয়ার ভয়ে ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কান্নার ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে গণমাধ্যমে। ভুলে গেলে চলবে না, দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের ঘাটতির কারণে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। নানা ঝুঁকি নিয়েও শ্রমিকরা বিদেশে যেতে চান। বিশ^জোড়া করোনা মহামারীর পরেও বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিভিন্ন দেশে গেছেন। করোনার কারণে অনেক দেশে কাজের চাহিদা কমে গেছে। এ কারণে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। এসব শ্রমিকের অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এ অবস্থায় কেবল দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরাই নন, তাদের পুরো পরিবারই ঝুঁকিতে আছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরতে যা কিছু করণীয় তা গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুতগতিতে করা উচিত।
প্রবাসী শ্রমিকদের অভিযোগ, বিমান কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি নিতে না পারায় লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি হয়েছে। শনিবার বিমানের রিয়াদগামী ফ্লাইট (বিজি-৫০৩৯) সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ছাড়ার কথা ছিল। এজন্য নির্দেশনা অনুসারে ছয় ঘণ্টা আগে লকডাউনের মধ্যে শুক্রবার রাত ১টার মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তারা। কিন্তু এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। পরে আরও পাঁচটি ফ্লাইটের চারটিই বাতিল হয়েছে। লকডাউনের মধ্যে পরিবহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে, ট্রাকে, অতিরিক্ত ভাড়ার গাড়িতে শ্রমিকরা ঢাকায় এসেছিলেন। বেবিচকের এমন অদক্ষতায় যাত্রীরা যে সীমাহীন দুর্ভোগের স্বীকার হলেন, তার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই! লকডাউনের আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন অনেক শ্রমিক কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। রয়েছে কাজ হারানোর শঙ্কা। দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে গত ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সরকার ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ জারি করে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে গত ১৫ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে গতকাল থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরে অন্তত ১২০টি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাতেই খবর ছড়িয়ে পড়লে শনিবার থেকে বিশেষ ফ্লাইট চালুর সংবাদ শুনে ‘লকডাউনের’ মধ্যেও ঢাকায় ছুটে এসেছেন শ্রমিকরা। রমজান ও করোনার এই দুঃসময়ে পরিবারের বাইরে ভাসমান অবস্থায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক যে অবর্ণনীয় দুঃখ ভোগ করছে তার অতি দ্রুত পরিসমাপ্তি হওয়া দরকার।
করোনা মহামারীতে বিশ^ব্যাপী বিপুল সংখ্যক মানুষের বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কার মধ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে না পারা খুবই দুঃখজনক। ইতিমধ্যে যেসব প্রবাসী শ্রমিকের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে তাদের নিরাপদে কর্মস্থলে যাত্রা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পাশাপাশি করোনা মহামারীর সময়ে লকডাউনের ভোগান্তি পেরিয়ে যারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় রওনা হয়েছেন, তাদের যাত্রা নিরাপদ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সজাগ থাকতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারের কর্মপরিকল্পনায় এনে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।