বিধিনিষেধ ৭ দিন বাড়ছে শিথিল ২৯ এপ্রিল থেকে

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমান বিধিনিষেধের আদলে প্রায় একই শর্তে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত বিধিনিষেধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হয়েছে। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় (৯টা) পর্যন্ত কোনো আদেশ জারি করেনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এদিকে ২৯ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধ শিথিল করা হতে পারে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দোকানপাট, শপিং মল খুলে দেওয়া হতে পারে। কয়েক দিন ধরেই ব্যবসায়ীরা এ দাবি করে আসছেন। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সরকার ঈদের আগে বিধিনিষেধ শিথিলেরও চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও    সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল সোমবার এক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধিনিষেধ এক সপ্তাহ বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেলেই আদেশ জারি করা হবে। একই সঙ্গে ২৯ এপ্রিল থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হতে পারে। ওই সময় সরকারি-বেসরকারি অফিসও খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দোকানপাট খুলে দেওয়া হলেও কিছু বিধিনিষেধ অব্যাহত রাখা হবে। ২৯ এপ্রিল থেকে কী করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে পরবর্তী বৈঠকে।’

এর আগে বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর সুপারিশ করে করোনা মোকাবিলাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। গতকাল রবিবার রাতে কমিটির এক ভার্চুয়াল সভায় এই সুপারিশ করা হয়। এরপর সপ্তাহ শেষে আবার করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বলেছে কমিটি।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, কভিড-১৯বিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি লকডাউনের মেয়াদ আরও সাত দিন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। বৈজ্ঞানিকভাবেও ১৪ বা ১৫ দিন লকডাউন না হলে সংক্রমণের চেইনটা পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয় না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে ২২ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত আগের শর্ত মেনে লকডাউন অব্যাহত থাকবে। সেই হিসাবে বিধিনিষেধ আরও সাত দিন বাড়ছে। সংক্রমণ ম্যানেজ করাটা আমাদের উদ্দেশ্য। সেটা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি কী হয়, সেটা বিবেচনা করেই পরে সিদ্ধান্ত হবে। আমরা মনে করছি বিধিনিষেধ আরও সাত দিন দিলে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার নিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সরকার প্রথমে ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি করেছিল। পরে তা আরও দুদিন বাড়ানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বিধিনিষেধের আওতায় সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং এসংক্রান্ত অফিসগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রয়েছে। প্রথমে ব্যাংক বন্ধের ঘোষণা দিলেও পরে তা আবার সীমিত পর্যায়ে খোলার সিদ্ধান্ত হয়। আর শিল্পকারখানা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু আছে। রাতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাচ্ছে না। খোলা স্থানে কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা-বেচা করা যাচ্ছে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত।

পরিকল্পিতভাবে ‘লকডাউন’ দেওয়া ও তুলে নেওয়ার পরামর্শ জাতীয় কমিটির : সারা দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে ‘কঠোর লকডাউন’ এক সপ্তাহ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে তারা। এ ছাড়া ধীরে ধীরে ‘লকডাউন’ শেষ করার পরিকল্পনা তৈরি রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লার সভাপতিত্বে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩১তম সভায় বিশেষজ্ঞরা এ পরামর্শ দেন। গতকাল সোমবার সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি কমপক্ষে দুই সপ্তাহের জন্য ‘পূর্ণ লকডাউন’ সুপারিশ করেছিল। সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’ ঘোষণা করায় কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করে। বৈজ্ঞানিকভাবে দুই সপ্তাহের কম ‘লকডাউনে’ কার্যকর ফলাফল আশা করা যায় না।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, দেশের অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে শিল্পকলকারখানা খোলা রাখার বিষয়টি কমিটি উপলব্ধি করে। তবে বেসরকারি দপ্তর, ব্যাংক খোলা রাখা, ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল, ইফতার বাজারে অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ভিড় লকডাউনের সাফল্যকে অনিশ্চিত করে। ‘লকডাউনের’ সময় স্বাস্থ্যসেবা, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। খোলা রাখা যাবে এমন জরুরি সেবার তালিকা প্রকাশ করারও অনুরোধ জানানো হয়েছে কমিটির পক্ষ থেকে। অন্যথায় বিরূপ পরিস্থিতির আশংকা রয়েছে। চলমান ‘লকডাউনে’ চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের চলাচলে বাধা ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে।

বিজ্ঞপ্তিতে ডিএনসিসি কভিড হাসপাতাল চালু হওয়ায় সরকারকে অভিনন্দন জানানো হয়। রোগী ভর্তির বাড়তি চাপ থাকায় দ্রুত আরও সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। নমুনা পরীক্ষা সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে কমিটি এর মধ্যে সরকারি নমুনা পরীক্ষা বিনামূল্যে করার পরামর্শ দিয়েছে। পিসিআর টেস্ট কিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বেসরকারি পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষার মূল্য পুনর্নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে করে যেমন পরীক্ষার সংখ্যা বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসবে ও সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা করা যাবে। সরকারি ল্যাবরেটরিতে চাপ কিছুটা কমবে। এতে রোগীদের পরীক্ষা ও রিপোর্ট দ্রুত প্রদান করে আইসোলেশন নিশ্চিত করা যাবে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল, ক্লিনিকে অন্তঃসত্ত্বা করোনা/নন-করোনা মায়েদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিন্তে করার জন্য অনুরোধ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। এতে বলা হয়, করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে অবশ্যই অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ডিএনসিসি হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের একটা কর্নারে বিশেষায়িত (আইসিইউ) ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। প্রতিটি হাসপাতাল তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী ‘চেইন অব রেফারেন্স’ সিস্টেম মেনে চলবে।

সব মৃদু করোনা রোগীর বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য টেলিমেডিসিন সেবা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে কোয়ালিটি সেবা নিশ্চিত করার জন্য টেলিমেডিসিন সেবা নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।