রাজধানীর কলাবাগানে বন্ধুর বাসায় ‘ধর্ষণের পর হত্যা’র শিকার ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী আনুশকা নুর আমিনের ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) প্রতিবেদনে তার সঙ্গে ঘটনার দিন একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে ঘটনার সময় আনুশকার কথিত বন্ধু ফারদিন ইফতেখার দিহানের একারই উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন সিআইডির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
জানা গেছে, সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব থেকে আনুশকার ডিএনএ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কয়েকদিন আগে কলাবাগান থানা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই স্কুলছাত্রী আনুশকার মৃত্যু হয়েছে।
সিআইডির শীর্ষ পযায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযুক্তের (দিহানের) বাসায় মেয়েটির (আনুশকা) সঙ্গে অন্য কেউ ছিল না। ডিএনএ প্রতিবেদনে মেয়েটির শরীরে দিহান ছাড়া কারও স্পর্শের আলামতও পাওয়া যায়নি। তবে তাদের দুজনের সম্মতিতেই অস্বাভাবিক এক ধরনের সম্পর্ক স্থাপন হয়েছিল। সেই সম্পর্কের সময় মেয়েটার শরীরে বাহ্যিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। আর সেটার আঘাতেই শরীরের ভেতরের রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় মেয়েটির।’
এদিকে ঘটনার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আনুশকার মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারছে না পুলিশ।
আনুশকার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিল ‘ধর্ষণ ও হত্যা’র সঙ্গে দিহান ও তার বন্ধুরা জড়িত। সিআইডির প্রতিবেদন নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি দিহানকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য এতসব আয়োজন হচ্ছে।
তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আনুশকার মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে না পারার কারণ জানতে চাইলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান মো. মাকসুদ বলেন, ‘মৃতের বয়স নির্ধারণসহ অন্যান্য প্রতিবেদন প্রস্তুত আছে। সিআইডির ল্যাব থেকে ভিসেরা প্রতিবেদনও হাতে এসেছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হবে।’
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি (ফরেনসিক) মো. সাহাদাত হোসাইন দেশ রূপান্তরকে জানান, আনুশকার মৃত্যুর ঘটনায় ডিএনএ প্রতিবেদন তৈরি করে কয়েকদিন আগেই মামলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির বিশেষ সুপার (ফরেনসিক) রুমানা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করে কয়েকদিন আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছি। ডিএনএ প্রতিবেদনে দিহানের উপস্থিতি ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতি পাইনি।’
তবে আনুশকার বাবা সিআইডির এই ফরেনসিক প্রতিবেদন মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার শুরুতে দ্রুত সব কিছু হচ্ছিল। সবার সাহায্যও পাচ্ছিলাম। তবে ধীরে ধীরে মামলার তদন্তের গতি কমে যায়। সিআইডি ডিএনএ করার নামে দুই মাস অপেক্ষা করায়। তখনই বুঝেছি। ছেলেটাকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য এতসব আয়োজন হচ্ছে। আমি এই প্রতিবেদন বিশ্বাস করি না। আমরা এই মামলার তদন্ত নিয়ে অনেকটাই হতাশ।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ চন্দ্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনুশকার মরদেহের ডিএনএ প্রতিবেদন আমাদের হাতে এসেছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো আমাদের হাতে আসেনি। এই প্রতিবেদনগুলো ছাড়া মামলার অন্যান্য অগ্রগতি সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আমাদের কাছে এলে তদন্ত যাতে সঠিক হয় এ জন্য প্রাপ্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে।’
গত ৭ জানুয়ারি দুপুরে নিজ বাসায় ডেকে নিয়ে আনুশকাকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ রয়েছে দিহানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ৭ জানুয়ারি রাতেই আনুশকার বাবা দিহানকে একমাত্র আসামি করে কলাবাগান থানায় মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা এ মামলায় ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয়। ঘটনার দিনই দিহানকে আটকের পর গ্রেপ্তার দেখায় কলাবাগান থানা পুলিশ। আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে দাবি করেন, যৌন সম্পর্কের একপর্যায়ে রক্তক্ষরণে আনুশকার মৃত্যু হয়। তবে দিহানের এই দাবিকে নাকচ করে আনুশকার পরিবার। তারা বলছেন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে আনুশকাকে। আর এই কাজে মূল অভিযুক্ত দিহানসহ তার আরও তিন বন্ধু জড়িত ছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আনুশকার ময়নাতদন্তের পর ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া অভিযুক্ত দিহানের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ’র নমুনা পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হয়।