যে গমে সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিন থাকে বর্তমানে সেই গমই বাংলাদেশে আনা হয়। কিন্তু সাড়ে ১০ শতাংশ প্রোটিন থাকলেই তা আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে নিম্নমানের পচা গম যা উন্নত দেশে অনেক ক্ষেত্রে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয় তা দেশে প্রবেশ করার পথ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
বাংলাদেশে আগেও সাড়ে ১০ শতাংশ প্রোটিনের গম এসেছে। সেই সময় হরদম নিম্নমানের গম প্রবেশ করেছে। সেই মানদ- বা বিনির্দেশের আলোকেই ২০১৫ সালে ব্রাজিল থেকে পচা গম আমদানি করা হয়। পুলিশসহ অন্যান্য রেশন সুবিধাভোগীদের তীব্র আপত্তির মুখে সরকার তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। বিষয়টি নিয়ে সেই সময় সংসদে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নতুন উচ্চমানের হাই প্রোটিনযুক্ত গম আনার নীতিমালা করা হয়।
গম না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে সেই উদ্যোগ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা বা বিনির্দেশ পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারের ভা-ারে খাদ্যের মজুদ কমে গেছে। গত বছর এই সময় যেখানে ২ লাখ ৮০ হাজার টন গম ছিল, এ বছর সেখানে আছে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন। চালের মজুদ পরিস্থিতিও ভালো নয়। বর্তমানে মজুদ ৩ লাখ ৭১ হাজার টন, যা গত বছর এই সময় ছিল ১২ লাখ টন। খাদ্যশস্যের মজুদ তলানিতে একদিনে যায়নি। সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়ে হাত বাড়ায় বিশ^বাজারে। বাংলাদেশের খাদ্য সংকট টের পেয়ে দাম বেড়ে যায় আন্তর্জাতিক বাজারেও। অতিরিক্ত দামের কারণে খাদ্য অধিদপ্তরের তিনটি টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়।
খাদ্য সচিব নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানিকৃত গমের প্রোটিনের মাত্রা কমানোর একটি প্রস্তাব আছে। তা পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
গম না পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা গমের প্রোটিনের মাত্রা কমানোর পরামর্শ দেয় সরকারের নীতিনির্ধারকদের। কম মাত্রার প্রোটিন হলে গম সরবরাহে সমস্যা নেই বলে তারা জানায়। তাদের প্ররোচনায় সরকারের একটি অংশ বিনির্দেশ পরিবর্তনের কথা বলে। গত মাসে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠকে বিনির্দেশ পরিবর্তনের জন্য বলা হলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ বৈঠকে অংশ নেওয়া কিছু মন্ত্রী এর বিরোধিতা করেন। পরিবর্তরনের পক্ষের মন্ত্রীরা এরপরও চাপাচাপি করলে তা খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। আগামীকাল সেই পরিধারণ কমিটির বৈঠক। সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে কম প্রোটিনের গম আমদানি করা হবে কিনা।
বৈঠকে বোরোর উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। উৎপাদন মূল্য পর্যালোচনা করে বোরোর দর নির্ধারণ করা হবে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বলেছেন, সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৫ লাখ টন ধান ও চাল কিনতে চায়। আমদানিকৃত আর অভ্যন্তরীণ বাজারের চাল দিয়ে নিরাপদ মজুদ গড়ে তুলতে হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট রয়েছে। তাদের কাজ হচ্ছে খাদ্যশস্যের চাহিদা, জোগান, সহজলভ্যতা, বাজার পরিস্থিতি এসব বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া। এই ইউনিটের আওতায় খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি গঠন করা হয়। দেশে খাদ্য নীতিনির্ধারণী বিষয়ে এটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ফোরাম। খাদ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ কমিটিতে অর্থ, কৃষি, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্যসহ আট মন্ত্রী রয়েছেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও জাতীয় গম ইনস্টিটিউটের মতামত চায় কম প্রোটিনের গম আনার বিষয়ে। এই অবস্থায় পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও জাতীয় গম ইনস্টিটিউটের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বৈঠকে।
আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাংলাদেশের গম আমদানির বর্তমান যে বিনির্দেশ বা নীতি তাতে নিম্নমানের গম আসার সুযোগ নেই। সাড়ে ১২ মাত্রার প্রোটিনযুক্ত ভালো মানের গম আনতে গেলে টেন্ডারকারীদের কম লাভ হয়। সাড়ে ১২ প্রোটিনের গম উৎপাদন হয় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে। ওইসব দেশ থেকে গম আনতে গেলে লাভের পরিমাণ কম হয়। এই মানের গম ভারতের পাঞ্জাবেও কিছুটা উৎপাদন হয়। কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তা অনেক সময় পাওয়া যায় না। আর সাড়ে ১০ থেকে ১১ প্রোটিনের গম সহজেই ভারত থেকে আনা যায়। মূলত সরবরাহকারীদের সুবিধার জন্য গমের বিনির্দেশ বদলের চেষ্টা করা হচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রোটিনের মাত্রা কম হলে এখানে টনপ্রতি দাম কমবে ৬ থেকে সর্বোচ্চ ১০ ডলার। সরকার এই ১০ ডলার কমানোর চেষ্টা কেন করবে? এই গম অত্যন্ত সেনসিটিভ একটি বিষয়। সেনাবাহিনীর রেশনে এই গম ব্যবহার করা হয়। পুলিশ সদস্যদেরও এই গম দেওয়া হয়। এ ছাড়া সরকারের নানামুখী খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে এই গম ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ব্রাজিলের গম কেলেঙ্কারির কথা কি আমাদের মনে হয় না। পচা গম আনার জন্য তোপের মুখে পড়েছিলেন তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। গমের বিনির্দেশ বদল করে সেই সময় তিনি কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। আমরা আবার কেন সেই পথে হাঁটব? আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। আমাদের চোখ উন্নত দেশের দিকে। তাই যদি হয় তাহলে আমাদের নজরটা কেন ভালো গমের দিকে না হয়ে, পচা গমের দিকে? একসময় আমাদের লক্ষ্য ছিল চাল হলেই হলো। আজ আমরা সেই জায়গায় নেই। আজ আমরা পুষ্টিকর চাল দিতে চাই। যেখানে পুষ্টিকর চালের কথা বলছি সেখানে গমের পুষ্টি কমানোর কথা বলি কী করে। এটা সরকারি নীতিনির্ধারকদের বিপরীতমুখিতা, যা কখনই কাম্য নয়।
তিনি আরও জানান, ব্রাজিলের পচা গম নিয়ে কম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়নি। পুলিশসহ ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা সরাসরি অভিযোগ করে বলেছিল, এসব গম খাওয়ার অযোগ্য। প্রথমে এসব গম ফেরত নেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় যথাযথ সাড়া না দেওয়ায় পুলিশ বিষয়টি জানিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমদানি করা গম পচা কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) গুদাম থেকে গমের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছিল। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে গুদাম থেকে কমপক্ষে এক কেজি পরিমাণ গম সংগ্রহের পর সিলগালা করে বিশেষ বাহকের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কম প্রোটিনের গম আনতে গেলে আবার সেই সমস্যায় পড়তে হবে।
গম আনার বিনির্দেশ বদল করে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ঘোষণা দিয়েছিলেন আর নিম্নমানের গম দেশে আসবে না। তিনি ২০১৭ সালের ২৯ জুন সংসদে বলেন, ‘এখন থেকে যে গম সংগ্রহ করা হচ্ছে, তার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকবে না। এবার সাড়ে ১২ প্রোটিনের গম আমদানি করা হচ্ছে। এর বাইরে কোনো গম আনা হবে না।’
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল দেশে কত শতাংশ প্রোটিনের গম আনা উচিত। কিন্তু তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই ইনস্টিটিউটের অপর একজন অধ্যাপক জানান, কম প্রোটিনযুুক্ত গম আমাদের মতো গরম আবহাওয়ায় সংরক্ষণ করা হলে তাতে ময়েশ্চার বা আর্দ্রতা বেড়ে যাবে, যা টক্সিন বাড়াবে। আমাদের দেশে যেসব গম উৎপাদন হয় সেগুলোর ১৮টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাতে ১১ দশমিক ২ শতাংশ প্রোটিন থাকে। এটা খেলে মানবদেহের পুষ্টির তেমন কোনো তারতম্য হবে না। এর বড় কারণ হলো আমাদের এখন প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের মাত্রা বেড়েছে। বিদেশ থেকে ১১ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করা যেতে পারে, তার নিচে নয়। সম্ভব হলে সাড়ে ১২ শতাংশই বহাল রাখা উচিত।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ মুজিবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিনের গম কম পাওয়া যায়। বিনির্দেশটা কমালে গম সংগ্রহে সুবিধা হবে।’
কমানোর সুযোগে দেশে পচা গম প্রবেশের যে সুযোগ তৈরি হবে তা নিরসন করা হবে কীভাবে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরই তা নিশ্চিত করবে।
দিন দিনই বাংলাদেশে গমের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু জমি কম থাকায় এবং উপযোগী আবহাওয়া না থাকায় গমের চাষ কমছে। তাই চাহিদার বড় অংশই আসে বিদেশ থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রেকর্ড পরিমাণ ৫৫ লাখ ১২ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। এরপরও করোনার অজুহাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে গম ও গমের তৈরি আটা, ময়দার দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর গমের আমদানির পরিমাণ ৩১ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও কমেছে মণপ্রতি প্রায় ৭০ টাকা। তবুও নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দাম পাইকারি বাজারে বেড়েছে মণপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশে চলমান সাধারণ ছুটিকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়েছেন আমদানিকারক ও মিল মালিকরা।