২০২০ সালের জানুয়ারি-আগস্টের সময়কালে বিশ্বব্যাপী পোশাকের আমদানি ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে চলা করোনা মহামারীর কারণে পোশাক খাতের ভ্যালু চেইনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক পর্যায়ে যে মধ্যমেয়াদি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে। শুধুমাত্র জাতীয়-স্তরের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা ক্রমাগত কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাসহ অনেক সরবরাহকারী দেশের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর গতিতে চলেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘ভ্যালু-চেইনভিত্তিক সমাধান’ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এবং ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ অব শ্রীলঙ্কার (আইপিএস) গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
‘বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার পোশাক খাতের পুনরুদ্ধার : ভ্যালু-চেইনভিত্তিক সমাধান কি সম্ভব?’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সংলাপে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সিপিডি, আইপিএস এবং ৫২টি চিন্তক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেটওয়ার্ক সাউদার্ন ভয়েজের সহযোগিতায় এই সংলাপটি আয়োজন করা হয়। গত মঙ্গলবার এই সংলাপটি ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি-জুন মহামারীর সময়কালে ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি বড় সরবরাহকারী দেশকে বঞ্চিত করেছে। সংলাপে উপস্থাপিত এক গবেষণায় দেখানো হয়, ২০২০ সালের এপ্রিলে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক বিক্রি ৭৯ শতাংশ কমে যায়। এ সময় সরবরাহকারীদের রপ্তানি আদেশ কমে ৭৬ শতাংশ। ওই সময়ে পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বাংলাদেশের। সর্বোচ্চ ৯৩ শতাংশ রপ্তানি আদেশ কমে বাংলাদেশের। এ ছাড়া একই সময়ে ভিয়েতনামের ৮০, চীন ৭৪ ও ভারতের ৬১ শতাংশ পোশাক রপ্তানি আদেশ কমে।
সংলাপে অংশ নিয়ে সিপিডি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘আইএলও সরবরাহকারী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক চাহিদা ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা দেশগুলোকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে একটি উদ্যোক্তা ভূমিকা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। সরকার, নিয়োগকারী এবং শ্রমিকসহ ত্রিপক্ষীয় সংলাপ করা উচিত, যাতে কেবল কভিড সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানের জন্য বেকার বীমা ব্যবস্থার পারস্পরিক সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।’
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সংলাপে সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, পোশাক খাতের ভ্যালু-চেইনের অংশীজনরা অতিমারীতে প্রভাবিত হয়েছিল। এই খাতকে টেকসই করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে সব অংশীজনের কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘সিপিডি এবং আইপিএস সম্প্রতি স্থানীয় পোশাকের পুনরুদ্ধার বিষয়ে একটি ভ্যালু-চেইনভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করার জন্য যৌথভাবে সাউদার্ন ভয়েজের সহযোগিতায় একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে।’ মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী পোশাক খাতে ভ্যালু-চেইনের যে ক্ষতি হয়েছে তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই গবেষণা সরবরাহকারী দেশসমূহ বিশেষত বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কায় যে চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলায় সহায়তা করবে।’
মূল বক্তব্য উপস্থাপনায় সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং আইপিএসের অর্থনীতিবিদ কিথমিনা হিউজ জানান, গবেষণায় দেখা গেছে বড় দেশগুলো এই মহামারীর সময়ে সীমিতসংখ্যক সোর্সিং দেশগুলোতে বেশি গেছে। এ সময়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্রেতাদের কাছ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। মহামারীকালে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি বড় সরবরাহকারী দেশকে বঞ্চিত করেছে।
তারা জানান, বিশ্লেষণে দেখা যায় সরবরাহকারী দেশগুলোতে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্ডার পুনরায় বিতরণ করা যেতে পারে যদি কভিডপূর্ব সময়ের রপ্তানির আদেশের অংশ বজায় রাখা সম্ভব হয়।
সমীক্ষায় প্রস্তাব করা হয়েছে, যেকোনো বড় বৈশ্বিক সংকটের ক্ষেত্রে সংকটপূর্ব পর্যায়ের রপ্তানি আদেশ নিশ্চিত করার জন্য একটি পুনঃবিতরণ পদ্ধতি অব্যাহত রাখতে হবে, বিশেষত যেসব দেশ আর্থিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
সংলাপের বিশেষ বক্তা শ্রীলঙ্কার এমএএস হোল্ডিংসের স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সফরমেশন বিভাগের পরিচালক হুসনি সালিহ বলেন, ‘ভ্যালু-চেইনের মান বেড়ে যায় যদি সব অংশীজন একসঙ্গে কাজ করে, বিশেষ করে এ রকম সংকটময় পরিস্থিতিতে। তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় তবে বিদ্যমান ভ্যালু-চেইনের মধ্যে সহনশীলতা তৈরির মাধ্যমে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।’
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মোস্তাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘চলমান সংকটে ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধ ব্যবসায়িক আচরণের অভাব রয়েছে। ব্র্যান্ডগুলো তাদের সরবরাহকারীদের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং দায়িত্বপূর্ণভাবে কাজ করা উচিত।’
শ্রীলঙ্কার ডিজাইন কালেক্টিভ স্টোরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিনু বিক্রমাসিংহে বলেন, ‘তার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এই অতিমারীর জন্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, বিশেষ করে ঋণ পাওয়া ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে। অনলাইন বাণিজ্য এই অতিমারীতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।’
এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি পিয়েরের মতে, এই অতিমারীর কারণে ব্যবসা সহজ করতে আধুনিকায়নের তাৎপর্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার উচিত কীভাবে বাজারকে পণ্য বৈচিত্র্য, পণ্যগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত পরিষেবা এবং অতীতের তুলনায় উচ্চতর ব্যবসায়ের সম্ভাবনা অর্জনের ক্ষেত্রে বাজারকে আরও প্রস্তুত করা যায়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর ড্যান রিস বলেন, ‘শুধু খাতভিত্তিক পরিমাপ বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করতে পারবে না। সহনশীলতা তৈরি করতে এবং শ্রমিকদের রক্ষা করতে অংশীজনদের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়েজন।’