করোনা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে

প্রাণে বেঁচে গেলেও রানা প্লাজাধসের ঘটনায় আহত অনেক শ্রমিকই আগের চেয়েও দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। এখনো ১৪ শতাংশ শ্রমিকের স্বাস্থ্য অবনতির দিকে রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৮.৫ শতাংশ শ্রমিকের স্বাস্থ্য মোটামুটি স্থিতিশীল এবং ২৭.৫ শতাংশ সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রয়েছে। ১৪ শতাংশ শ্রমিকের মধ্যে বেশির ভাগই মাথাব্যথা, হাত ও পায়ে ব্যথা, কোমর ব্যথা এমন বড় সমস্যা নিয়ে জীবন যাপন করছেন বলে অ্যাকশনএইডের জরিপে উঠে এসেছে।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির অষ্টম বার্ষিকীতে ‘কভিভ-১৯ : চ্যালেঞ্জেস ফর দ্য রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি সারভাইভার্স’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য সামনে রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল সংলাপে এ জরিপ ফলাফল উপস্থাপন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত ১ হাজার ৪০০ শ্রমিকের ডেটাবেইস থেকে ২০০ জনকে নমুনা হিসেবে নিয়ে এ জরিপ চালায় সংস্থাটি।

অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে দেখা যায়, ১২.৫ শতাংশ এখনো মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে, যা গত বছরে ছিল ১০.৫ শতাংশ। অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে গত বছরের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি শ্রমিকের। তবে বর্তমানে ৬২ শতাংশ শ্রমিকের মানসিক স্বাস্থ্য মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। এ বছর ২৫.৫ শতাংশ শ্রমিক মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে ভালো অবস্থানে আছেন, যা গত বছর ছিল ২১ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ৪.৫ শতাংশ বেশি শ্রমিক মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে উন্নতি লাভ করতে পেরেছেন।

দুর্ঘটনার পর অনেকেই শারীরিক ও মানসিক কারণে কাজে ফিরে যেতে পারেননি। অনেকে কাজে ফিরলেও ঘোরাতে পারেননি ভাগ্যের চাকা। জীবন ধারণের তাগিদে অনেকে আবার বদলেছেন কাজের ধরন। তার ওপর করোনা মহামারী তাদের জীবনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে।

বেশির ভাগ পরিবারেই উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একজন। তার ওপর করোনার প্রভাবে হ্রাস পেয়েছে উপার্জন। তাদের আয়ের চিত্রের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এসব কাজ করে ১০.৫ শতাংশ শ্রমিক ৫ হাজার ৩০০ টাকার নিচে আয় করেন। ৩৭.৫ শতাংশ শ্রমিক আয় করেন ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ৩০০ টাকা। ২৯.৫ শতাংশ লোকের আয় ১০ হাজার ৩০০ থেকে ১৫ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে। উদ্বেগজনক হলেও সত্য, ৯.৫ শতাংশ শ্রমিকের নেই কোনো আয়। অথচ এসব পরিবারে খাদ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, বাচ্চাদের পড়াশোনা ইত্যাদি জরুরি খাতে ১০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়।

অন্যদিকে ৬৭ শতাংশ মানুষ কারখানাগুলোয় সঠিক নিয়মনীতি ও কর্মঘণ্টা বজায় রাখার কথা স্বীকার করলেও ৩৩ শতাংশ বলছেন, কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেন তারা। কারখানাগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি তেমন মানা হচ্ছে না বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।

এই ভার্চুয়াল সংলাপের উপস্থিত প্রধান অতিথি ও সাংসদ শিরিন আক্তার বলেন, ‘দেশে শ্রম আইনের বাস্তব প্রয়োগ হলে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা আদায় করা সম্ভব। তা ছাড়া ক্ষতিপূরণ আইন স্বচ্ছভাবে তৈরি করা প্রয়োজন। কারখানায় সুন্দর কর্মপরিবেশ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি করার জন্য ট্রেড ইউনিয়ন, মালিক ও সরকারপক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

গবেষণার জরিপ সম্পর্কে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘আট বছরেও এত বিশালসংখ্যক শ্রমিকের এ অবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ এ দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের অক্সিজেন বলা হয় শ্রমিকদের। ঔপনিবেশিক মনমানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে শ্রমিকের ন্যায্য দাবি পূরণ করতে হবে।

শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের আহ্বায়ক হামিদা হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর রানা প্লাজা দুর্ঘটনার তারিখে শ্রমিকদের কবরস্থানে যাই। জায়গা দিন দিন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখানে শ্রমিকদের স্মরণে বড় একটি মনুমেন্ট হওয়ার কথা ছিল, তবে বাস্তবে তা হয়নি।

ডায়লগে উপস্থিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পোটিয়াইনেন বলেন, ‘শ্রম ইস্যুতে নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থায় উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে আর এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে এবং এটি নিশ্চিতকরণে সরকারকে আইন প্রণয়ন করতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আট বছরেও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের জীবনে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। কর্মক্ষেত্রেও তাদের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে যারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত দেখা যায়। তাদের চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে থানা পর্যায়ে রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যকার্ড বিতরণ করা  এবং আহতদের স্বাস্থ্যবীমা প্রণয়ের আহ্বান জানান তিনি।

এই ভার্চুয়াল সংলাপে যুক্ত ছিলেন এস অলিভারের সিনিয়র সাসটেইনেবিলিটির কো-অর্ডিনেটর তাজুল ইসলাম, এসএ টিভির বিজনেস এডিটর সালাউদ্দিন বাবলুসহ অনেকে।