রাজধানীর পুরান ঢাকায় যখনই কোনো রাসায়নিকের গুদামে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তখনই সচল করা হয় ওই এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানাগুলো সরানোর ফাইল। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়, পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে হয় দফায় দফায় বৈঠক। সিদ্ধান্ত হয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে কারাখানা সরানোর। এমনকি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের। কিন্তু কিছুদিনই পরই ওইসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগে ভাটা পড়ে। যেন আগুনের লেলিহান শিখার নিচেই চাপা পড়ে সিদ্ধান্তের ফাইলগুলো।
১০ বছর আগেও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের সব গুদাম ও কারখানা সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কথা ছিল পাশাপাশি সব অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তই আর বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো পুরান ঢাকার অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে রাসায়নিক গুদাম। বছর দেড়েক আগে যেখানে ছিল ২৫ হাজার অবৈধ গুদাম, সে সংখ্যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজারে।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতেও পুরান ঢাকার আরামানিটোলার একটি রাসায়নিক গুদামে অগুন লেগে প্রাণ গেছে চারজনের। এ গুদামটিও অবৈধ ছিল বলে জানা গেছে। এ নিয়ে তদন্ত চলছে। আর আগের সব অগ্নিকাণ্ডের মতো এবারও প্রাণহানির পর সক্রিয় হয়েছেন সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্তাব্যক্তিরা। আগামীকাল রবিবার রাসায়নিক গুদামগুলো সরানোর বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠকও হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। ভোট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় নেতাদের বিরোধিতার কারণেই সরানো যাচ্ছে না গুদামগুলো। এলাকাবাসীও একই ধরনের অভিযোগ করে বলেছেন, জেনেশুনেই তারা মৃত্যুর মধ্যেই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। সিলগালা করে দেওয়া হয় কারাখানা ও গুদাম। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে গুদামগুলো ফের খুলে দেওয়া হয়। গত দুই বছরে পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের ১১২টি কারখানা সিলগালা করার পাশাপাশি ১৭৩ জনকে কারাদ- দেওয়া হয়েছিল।
চলমান ‘লকডাউনের’ আগেও পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় হাজার হাজার রাসায়নিকের গুদাম। দেদার বিক্রি হচ্ছে দাহ্য পদার্থ। যুগ যুগ ধরে পুরান ঢাকায় রয়েছে রাসায়নিকের গুদামগুলো। কারাখানাগুলোতে আছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসো-প্রোইলসহ ভয়ংকর সব রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক সামান্য আগুনের স্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। এসব গুদাম থেকে রাসায়নিক আনা-নেওয়া করছেন ব্যবসায়ীরা। পুরান ঢাকায় যে বাড়িগুলোতে কারখানা করা হয়েছেÑ অভিযানের সময় সেগুলোর রাজউকের অনুমোদনও দেখাতে পারেন না মালিকরা। আর অবৈধ পণ্যগুলোর বিএসটিআইয়ের অনুমোদনও নেই। এমনকি কারও কারও সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স পর্যন্তও নেই। কারখানার জন্য ফায়ার সার্ভিস বা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেই বেশিরভাগেরই। কোনো কোনো রাসায়নিক পণ্যের মজুদের জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখানকার ব্যবসায়ীরা যেন এসবের তোয়াক্কা করেন না। বেশিরভাগই ব্যবসা করে যাচ্ছেন অনানুষ্ঠানিকভাবে। এমনকি অনেকে ব্যাংকিং চ্যানেলেও টাকা লেনদেন করেন না। চকবাজার এলাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের কাছে আমরা অসহায়। তাদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের গভীর সখ্য। তাছাড়া ভোটের হিসাব তো আছেই। নেতাদের কারণে গুদাম ও কারখানাগুলো সরানো যাচ্ছে না। আমরা আগুনে পুড়ে মারা গেলেও নেতা ও ব্যবসায়ীদের কিছু যায় আসে না। বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে এসব দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। এখনো সময় আছে দ্রুত সময়ের মধ্যে গুদামগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। এমনও সময় আসবে এজন্য আমাদের আন্দোলনে নামতে হবে।’
২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর নবাব কাটরায় বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণ থেকে রাসায়নিকের গুদামে লাগা আগুনে ১২৪ জন পুড়ে অঙ্গার হন। পুড়ে যায় ২৩টি বসতবাড়ি, দোকান ও কারখানা। এ ঘটনার পর সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা দফায় দফায় বৈঠক করেন। ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল পুরান ঢাকা থেকে সব রাসায়নিক কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর এজন্য রাজধানীর উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচরে বিশাল জায়গায়ও চূড়ান্ত করা হয়। এজন্য বিসিকের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে একটি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে আরেকটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ৩ জুন তৎকালীন শিল্প সচিব বলেছিলেন, কেমিক্যাল পল্লীতে সাততলা ১৭টি ভবন তৈরি করে গুদাম ও কারখানাগুলো সরানো হবে। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে ২০ একর জায়গায় পল্লী স্থাপন করারও কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু দিনের পর দিন ধরেই চলে এসব আলোচনা। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ওই সময় মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকে ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেছিলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কারণে গুদাম সরানো যাবে না। এগুলো না সরালে প্রায়ই বড় ধরনের অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটবে। এমনকিও ওই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন মহাপরিচালকও প্রায় একই ধরনের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। আর ফায়ারের সার্ভিসের অভিযোগগুলোর সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকা কর্মকর্তারাও একমত পোষণ করেছিলেন। আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, ইসলামপুর ও চাঁনখারপুলসহ আশপাশ এলাকার আবাসিক ভবনে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ গুদামগুলো। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই। গুদামের ৯৮ ভাগই অবৈধ। মাত্র দুই ভাগ গুদামের অনুমোদন আছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে অবশ্যই রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরানো হবে। এতদিন কেন সরেনি তাও তদন্ত দেখা করা হবে। এতে কারও গাফিলতি থাকলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।’
আর ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘পুরান ঢাকায় যত্রতত্রভাবে কেমিক্যাল কারখানা গড়ে উঠছে। আজও (গতকাল) আরমানিটোলায় আরেকটি আগুনের ঘটনা ঘটল। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো সরিয়ে নিলে ভালো। এতে প্রাণহানির ঘটনা কমে আসবে।’
বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে একই মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজমের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।
ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি স্থানেই রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা আছে। কোনো নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। গুদাম ও কারখানাগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্যত্র সরানো উচিত। আরমানিটোলার অগ্নিকা-ের ঘটনার বিষয়ে আমরা তদন্ত করছি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিমতলীর ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি ১৭টি সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেয় সরকারের কাছে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে চকবাজারসহ অন্যান্য অগ্নিকা- এড়ানো যেত। নিমতলীর অগ্নিকা-ের পর গঠিত তদন্ত কমিটি ১৭টি সুপারিশ করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পুরান ঢাকার অধিকাংশ মহল্লা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। ঘনবদ্ধ ঘরবাড়ি, দোকানপাট, কুটিরশিল্পের আদলে অজস্র ছোট ছোট কারখানা ও বিপুল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা। ঝুঁকির মধ্যে লোকজন বসবাস করে। নানা রকমের রাসায়নিক পদার্থের মজুদ, ব্যবহার, কেনাবেচা ও পরিবহন চলে অহরহ। গুদাম বা কারখানাগুলো সরিয়ে না নিলে সামনের দিনগুলোতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বিসিক কেমিক্যাল পল্লী গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু কোনো সুপারিশই আমলে নেওয়া হয় না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের তালিকা অনুযায়ী সরকারিভাবে ১৩৭টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যভুক্ত ১ হাজার ১০০-এর বেশি ব্যবসায়ী আছে। কিন্তু বর্তমানে অবৈধ গুদাম রয়েছে ২৬ হাজারের মতো। দিনে দিনে এর সংখ্যা বাড়ছেই। প্রতিটির বাড়ির নিচে বেজমেন্টে বস্তার পর বস্তা, কনটেইনারের স্তূপ দেখা যায়। কোনোটি অতি দাহ্য পদার্থ আবার কোনোটি কম দাহ্য পদার্থ।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পুরান ঢাকার বাইরে টঙ্গী, গাজীপুর, নরসিংদী ও চট্টগ্রামে রাসায়নিক গুদাম আছে। অবৈধ পথেই কেমিক্যাল আসছে বেশি। আরমানিটোলায় যে গুদামটিতে আগুন লেগেছিল সেটির কোনো অনুমোদন ছিল না। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। আগামী রবিবার গুদাম সরানো নিয়ে একটি মিটিং হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা যায় না। গুদামগুলো কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচরে সরানোর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব।’
এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুদামের নকশা, আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ অন্তত ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। জাইলিন, এসিটন, রেড ফসফরাস, সালফার, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, পটাশিয়াম নাইট্রেট, নাইট্রোগ্লিসারিন, গানপাউডার, গানকটন, রঙিন আতশবাজি, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, ফসফরাস ও সালফার দেদার বিক্রি হয় পুরান ঢাকায়।