আরমানিটোলায় একটি কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে গতকাল নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে নিমতলী ও চুড়িহাট্টায় অগ্রিকান্ডে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যুর পর পুরান ঢাকার কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউনগুলো স্থানান্তরের তড়িঘড়ি করে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ নির্মাণে বড় অঙ্কের বরাদ্দও দেওয়া হয়। কিন্তু লম্বা সময় পার হয়ে গেলেও কাজে তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ তথ্য দিয়েছে খোদ সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে কাজে গাফিলতি রয়েছে বলে আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সরেজমিন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) বলছেন, নানা কারণে এই প্রকল্পের কাজে দেরি হয়েছে। ২০২২ সালের জুনে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।
আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনে একের পর অগ্নিকা-ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেই চলছে। এসব কারখানা স্থানান্তরে উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা রয়েছে।
এর আগে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনের এ প্রকল্প নেয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক)। কিন্তু সে প্রকল্প এগোয়নি। এরপর চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ৯ বছর আগে নেওয়া কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্প থেকে সরে এসে গত বছরের ১০ জুন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ৩০৮ একর জমিতে কেমিক্যাল শিল্পপার্ক স্থাপনের প্রকল্প ২০১৯ সালের মে মাসে একনেকে অনুমোদন হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ১৭টি পূর্তকাজের প্যাকেজের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়ন অন্যতম।
চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ পরিদর্শন করেন আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী। প্রকল্পটির পরিদর্শন প্রতিবেদনে অসন্তোষ প্রকাশ করে সচিব বলেন, এ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি হতাশাব্যঞ্জক। প্রকল্প পরিচালক আগামী জুন মাসে পিআরএল (অবসর) গমন করবেন। এ জন্য তার কাজের প্রতি আগ্রহ তেমন নেই। প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে দ্রুত একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করেন তিনি।
প্রতিবেদনে আইএমইডি সচিব জানান, প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পটির ১৭টি পূর্তকাজের প্যাকেজের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়ন অন্যতম। এই ভূমি অধিগ্রহণের কাজ ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে এবং ভূমি উন্নয়নের কাজ চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। পূর্তকাজের অন্যান্য প্যাকেজের কাজও আগামী জুনেই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পটির ভূমি অধিগ্রহণ কাজ শেষ হয়েছে এবং ভূমি প্রকল্প কর্র্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে। কিন্তু ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ বাস্তবে এখনো শুরুই হয়নি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে সচিব আরও জানান, প্রকল্পটি বিশাল এলাকাজুড়ে (৩০৮.৩৩ একর), যা ৩.৫০ মিটার উচ্চতায় মাটি ভরাট করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাটি ভরাটের কাজ শুরু করা হয়নি। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মাটি ভরাটের কাজ করা সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চিত। ভূমি উন্নয়নকাজ সঠিকভাবে করতে না পারলে প্রকল্পের অন্যান্য কাজ এগিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, অনুমোদনের পর কার্যাদেশ পেতে দেরি হয়েছে। এই প্রকল্পের মূল কাজ হচ্ছে মাটি ভরাট। মাটি ভরাট হয়ে গেলে বাকি কাজ এক-দুই মাসের মধ্যে টেন্ডার করা হবে। টেন্ডার হয়ে গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প সমাপ্ত করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয়ের সভায় মাটি ভরাটের কাজ অনুমোদন হয়ে গেছে। প্রথমে বিমানবাহিনী কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে মাটি ভরাটের কাজটি করার জন্য প্রস্তাব করেছি। ওই সময় আমাদের এ প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়নি। ওই সময় অনুমোদন হয়ে গেলে এত দিন মাটি ভরাটের কাজ হয়ে যেত। প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, বর্তমানে প্রকল্পটি সংশোধন করে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। কারণ ভূমি অধিগ্রহণে ১ হাজার কোটি টাকা ধরা ছিল। ভূমি অধিগ্রহণে আমাদের ৪৭০ কোটি টাকাও খরচ হয়নি। ডিপিপিতে যা ধরা ছিল তার তুলনায় অনেক কম অর্থে জমি ক্রয় করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের গাফিলতিসহ নানা কারণে ধীরগতি পুরনো সমস্যা। বহু আগে থেকে এসব সমস্যা জানা থাকলেও সমাধান হয়নি। আলোচ্য প্রকল্পের একই অবস্থা হয়েছে, যা মোটেও কাম্য নয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রায় ৪ হাজার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম রয়েছে। দাহ্য এসব রাসায়নিক গুদাম এলাকার বাসিন্দাদের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় পারফিউমের ফ্যাক্টরি ও গোডাউনে অগ্নিদুর্ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৩ জন প্রাণ হারান। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর সরকারের পক্ষ থেকে আবারও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে গতকাল পুরান ঢাকার আরমানিটোলা খেলার মাঠসংলগ্ন একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
আইএমইডি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও ড্রেন-কালভার্ট নির্মাণ, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, পাম্প ড্রাইভার কোয়ার্টার নির্মাণ, ফায়ার ব্রিগেড স্টেশন নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, পানির সরবরাহ লাইন, ইলেকট্রিক লাইন স্থাপন, গ্যাসলাইন স্থাপন, জেটি নির্মাণ, সিইটিপি, ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ইনসিনারেটর স্থাপন, দুটি মেইন গেট নির্মাণ। এ প্রকল্পে পরিকল্পিতভাবে প্রায় ২ হাজার ২৯০টি শিল্প কারখানা বা গোডাউন স্থাপন ও প্রায় ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।