মহামারী মোকাবিলায় প্রয়োজন সর্বাত্মক মনোযোগ

করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় দেশে চলছে ‘লকডাউন’। দ্বিতীয় ঢেউ আসবে এমন একটা সম্ভাবনার কথা সবাই জানলেও তা মোকাবিলার কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। যার কারণে চিকিৎসা-সংকটসহ শ্রমজীবী খেটে-খাওয়া মানুষ মহাবিপদে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা দিন এনে দিন খান তাদের কষ্টের সীমা নেই। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনাকালে শুধু শহরে কাজ হারিয়েছেন ১০ লাখ শ্রমিক। অন্যদিকে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে মৃত্যুহার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, শুধু মার্চ-২০২১-এ আক্রান্ত হয়েছেন ৬৫ হাজার ৭৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৬৩৮ জন। এখন প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা শতকের কাছাকাছি। করোনা তার ধরন পাল্টেছে। এখন জ্বর, সর্দি ছাড়াও করোনা শনাক্ত হচ্ছে। ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা বাংলাদেশে। আক্রান্ত বাড়তে থাকায় হাসপাতালে প্রকট হয়ে উঠেছে আইসিইউ ও সাধারণ শয্যা-সংকট। সারা দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য সাধারণ শয্যা রয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৭১১টি। আইসিইউ রয়েছে ৫৮৬টি, যা খুবই অপ্রতুল। আইসিইউর অভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন অনেক রোগী। হাসপাতালে সাধারণ শয্যায়ও স্থান পাচ্ছেন না রোগীরা। রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্সে মারা যাচ্ছেন। অথচ পেরিয়ে গেছে একটি বছর স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ছাড়াই। গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম রোগী আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫১ জন, মারা গেছেন পাঁচজন, এরপর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত বছর আগস্ট মাসে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করলেও এ বছর মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকে হঠাৎ বাড়তে থাকে। বাড়ছে আক্রান্ত, বেড়ে চলেছে মৃত্যু। বেসরকারি পাঁচতারকা হাসপাতালেও আইসিইউ মিলছে না। আইসিইউয়ের অভাবে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা দিয়ে রাখা হচ্ছে রোগীদের। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম দফা সংক্রমণের চেয়ে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ বহু গুণে শক্তিশালী। মফস্বলের হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও নাজুক।

করোনা মহামারীতে এরই মধ্যে পৃথিবীর ৩০ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ কোটিরও বেশি মানুষ। জনস হপকিন্স এ তথ্য জানানোর আগের দিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবাণী দেয় যে, মহামারী সর্বোচ্চ মাত্রার সংক্রমণের দিকে এগোচ্ছে।

এ দেশের সরকার করোনা প্রতিরোধে ১৮ দফা নির্দেশনা দিলেও জনগণের মধ্যে তা পালনে শৈথিল্য দেখা গেছে। ঢিলেঢালা লকডাউন শেষে এখন ‘কঠোর’ লকডাউন বলবৎ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিছুদিন আগের শিথিল লকডাউনের সময় তারা জীবিকার তাগিদে, ক্ষতির ভয়ে মার্কেট খোলা রাখার দাবিতে কোথাও কোথাও বিক্ষোভ করেছেন। গত এক বছরে করোনার প্রকোপে তারা অনেক কিছু হারিয়েছেন, অনেকে বেকার হয়েছেন, অনেক ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে ব্যবসায়ী-কর্মজীবী ও শ্রমিকরা জীবনের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে নেমে পড়েন, কিন্তু করোনার চলমান ঢেউ সবার মধ্যে আবার হতাশা সৃষ্টি করেছে। গত বছর মানুষের মধ্যে ভয়, জীবনের ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। ফলে গত আগস্টের দিকে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে দেখা গেছে। এ সময়ে মানুষ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেমে পড়েন, পাশাপাশি সরকারের প্রণোদনাসহ বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণার মধ্য দিয়ে জীবন ও অর্থনীতি অনেকটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তা ছাড়া প্রথমদিকে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে ভালো অবদান রেখেছে। তাতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি ঊর্ধ্বমুখী লক্ষ করা গেছে। তথাপি আমাদের বেকারত্ব, দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতি বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ জীবনের তাগিদে জীবিকার প্রয়োজনে ঘরে থাকতে পারছেন না। করোনার প্রথম ধাক্কায় বিশেষ করে শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা সামলে ওঠার চেষ্টার মধ্যে করোনার প্রকোপটা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি সবাইকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে।

করোনা মহামারীর অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। দ্য পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে এক বছরে মোট জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। মহামারীর কারণে অনেকের আয় কমে গেছে এবং জনসংখ্যার বড় একটি অংশ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে উঠে এসেছে জরিপের ফলাফলে।

বেকার হয়ে যাওয়ার কারণে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা। জীবনযাপনের খরচ বেড়ে যাওয়া, সঞ্চয় কমে যাওয়া ও ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তাদের সার্বিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল নতুন দরিদ্রতা সাময়িক। কিন্তু মহামারীর এক বছর পরও যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গিয়েছিলেন, তারা বের হয়ে আসতে পারেননি।’ প্রতিষ্ঠান দুটি এই র‌্যাপিড রেসপন্স গবেষণার জন্য প্যানেল জরিপের ভিত্তিতে গ্রাম ও শহরের ছয় হাজার বস্তিবাসীর ওপর জরিপ চালিয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, মহামারীর প্রথম ঢেউয়ে ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছিলেন। আগে যে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন নতুন এই ২২ শতাংশ মানুষ।

বর্তমানে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র। অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধার ও মহামারী মোকাবিলার সামর্থ্য মানুষ হারিয়েছেন। আয় কমে গেলেও তাদের ঋণ বেড়েছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জীবনযাপনের জন্য সংগ্রাম করছে। লকডাউনে দরিদ্র জনগোষ্ঠী যে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে, তা মহামারীর ভয়াবহতার চেয়ে কম উদ্বেগজনক নয়। লকডাউন ঘোষণার আগে এই জনগোষ্ঠীর কথা বিশেষভাবে ভাবার দরকার ছিল।

সর্বোপরি দ্বিতীয় দফার এ সংক্রমণকে অবহেলা করলে অনেক বড় ভুল হবে। বিনা চিকিৎসায়, বিনা পরিচর্যায় বহু লোক মারা যাবেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে এই মহামারী মানুষের জীবিকার ওপরে যে আঘাত হানবে, তা মোকাবিলা করা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। দেশে টিকা প্রদানের হার সন্তোষজনক নয়। ভাইরাসের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে বলে টিকার কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় থেকে যাচ্ছে। তাই টিকা নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক কথাসাহিত্যিক

gtanzia@gmail.com