করোনা মহামারীর প্রভাবে ঘরে নারীর কাজের চাপ ও অর্থকষ্ট বহুগুণ বেড়েছে। সন্তানদের অনলাইন ক্লাসে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ মা সহযোগিতা করছেন। যেখানে বাবার সহযোগিতা মাত্র ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ ছাড়া শহর ও গ্রামে ৪৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ পরিবার থেকে অন্তত একজন কাজ হারিয়েছেন বা কাজ পাওয়ার সুযোগ বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে শহরের ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং গ্রামে ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ‘বাংলাদেশে ২০২০-এ করোনা চলাকালে সংসারের সেবাকাজের দ্রুত বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল শনিবার এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ৯টি জেলার শহর ও গ্রামের বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষের মধ্যে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। পরিপ্রেক্ষিতের কথা ভেবে নারী উত্তরদাতার সংখ্যা বেশি ধরা হয়েছে। উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৮৭ জন নারী, ১৩ জন পুরুষ ও ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তাদের মধ্যে ২১৯ জন গ্রামের ও ২২৪ জন শহরের। এদের মধ্যে শতকরা ৫৮ জনের বয়স ৩১-৪৫ বছরের মধ্যে। উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৪৭ ভাগ গৃহিণী। বাকিরা অন্যান্য পেশাজীবী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গ্রাম ও শহরের পরিবারগুলোয় কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, দারিদ্র্যের হার কতটা বেড়েছে, নারীর আয় কতটা কমেছে, ঘরে নারী-পুরুষের কাজের আনুপাতিক হিসাব ইত্যাদি তুলে ধরার লক্ষ্যে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ফোরাম ‘ফরমাল রিকগনিশন অব দ্য উইম্যান’স আনকাউন্টেড ওয়ার্ক’-এর উদ্যোগে এই জরিপ পরিচালনা ও তৈরি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মী। এই ফোরামের সদস্য সংস্থাগুলো হচ্ছে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংস্থা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ, অক্সফাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
জরিপে অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৭৬ জন বলেছেন, মহামারীর সময়ে তাদের পরিবারের আয় কমে গেছে। যাদের মাসিক আয় ৫-১০ হাজার টাকা ছিল তাদের মধ্যে শতকরা ৬৮ জনের আয় কমেছে। এতে দরিদ্ররা আরও দরিদ্রতর হচ্ছে। ১০-১৫ হাজার টাকা আয়কারীদের শতকরা ৭৩ জনের আয় হ্রাস পেয়েছে। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো কিছুটা ভালো ছিল। তবে অকৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে। শতকরা ৭৭ দশমিক ৭৮টি নারীপ্রধান পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই অনানুষ্ঠনিক খাতের। এদের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে ঘরের কাজের চাপ।
উত্তরদাতাদের শতকরা ৮২ দশমিক ৭৮ জন মনে করেন, মহামারী তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। গ্রামীণ নারী উত্তরদাতাদের মধ্যে অর্ধেকই নিজেদের মানসিকভাবে দুর্বল মনে করছেন। বাকিদের মধ্যে শতকরা ২০ জন নিজেদের মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ভাবছেন। শহরের শতকরা ২৩ জন নারী নিজেকে মানসিকভাবে খুবই দুর্বল বলে মনে করছেন। গ্রামের শতকরা ৯৭ জন ও শহরের ৮৮ জন নারী নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের ঘুম কমে যাওয়া, ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়া, শরীর ও মাথাব্যথা বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার কথা বলেছেন। জরিপে আরও বলা হয়, করোনায় আশ্চর্যজনকভাবে শহরে নারীর কাজ ১২৮ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনার আগে গৃহিণীদের মধ্যে শতকরা ৭১ দশমিক ৫ জন সাধারণত ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা অমূল্যায়িত গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করতেন। করোনাকালে শতকরা ৩৭ দশমিক ৮ জনের কাজের সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে ঘরের কাজে পুরুষের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি। এ ছাড়া ইউএন উইম্যানের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সোকো ইশিকাওয়া, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, আর্থিক বিভাগের উপসচিব মেহেদী মাসুদুজ্জামানসহ অর্থনীতিবিদ ও এনজিওকর্মীরা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।