রাজধানীর পুরান ঢাকায় যখনই কোনো রাসায়নিকের গুদামে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তখনই ওই এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরানোর তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু শেষমেশ কোনো ফল আসে না। তবে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুরান ঢাকার আরামানিটোলার একটি রাসায়নিক গুদামে অগুন লেগে পাঁচজনের প্রাণহানির পর এবার কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। যেসব বাড়ির মালিক অবৈধ রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের কাছে জায়গা ভাড়া দিয়ে সহায়তা করছেন তাদের আনা হচ্ছে আইনের আওতায়। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে ওইসব বাড়ির মালিকের তালিকা তৈরির কাজ শুরুও করে দিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পাশাপাশি পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো সরানোর জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে গতকাল রবিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনলাইনে বিশেষ বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকেই অবৈধ রাসায়নিক কারবারিদের বিরুদ্ধে ‘হার্ডলাইনে’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট্ট আয়তনের পুরান ঢাকায় এত বিপুলসংখ্যক কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুদামের অবস্থান কতটা ভয়ংকর তা অগ্নিদুর্ঘটনাতেই উপলব্ধি করা যায়। সবার চোখের সামনে নির্বিঘেœ এসব ব্যবসা চলছে যুগ যুগ ধরে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি, পুরান ঢাকার অবৈধ রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে। বিশেষ করে যেসব বাড়ির মালিক অবৈধ ব্যবসায়ীদের ভাড়া দিয়েছেন তাদের একটি তালিকা করা হচ্ছে। তালিকার কাজ এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে বলে আশা করছি। তারপর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবার কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ (গতকাল রবিবার) পুরান ঢাকার বিষয় নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আরমানিটোলায় অগ্নিকা-ের ঘটনার পর থেকেই বাড়ির মালিক লাপাত্তা। তাকে আমরা খুঁজছি। তবে যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরান ঢাকায় অবৈধ রাসায়নিক দ্রব্যের কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সামর্থ্য আমাদের কম। এছাড়া ঢাকার বাইরের ঠিকানায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী পুরান ঢাকায় ব্যবসা করলেও কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পেলে সেটা বের করার উপায়ও আমাদের নেই। তারপরও আমরা অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের কারখানা চালানো, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুদাম করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বৈধভাবে এ ধরনের ব্যবসা করতে গেলে সরকারের একাধিক সংস্থার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় থানা, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ কমপক্ষে ছোট-বড় অন্তত নয়টি সরকারি দপ্তরের অনুমোদন নিতেই হয় কেমিক্যাল ব্যবসায়। বৈধভাবে ওইসব দপ্তর থেকে ছাড়পত্র নেওয়াটাও খুবই কঠিন ও জটিল। সরকারের নিয়মনীতি মেনে আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা করার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পুরান ঢাকায় যুগ যুগ ধরে চলে আসছে বিপজ্জনক এ ব্যবসা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে দিব্যি রাসায়নিকের ব্যবসা চালানো হচ্ছে। কখনো তাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হচ্ছে না। এজন্য কাউকে জবাবদিহিও করতে হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার লোকজনকে ম্যানেজ করেই চালানো হচ্ছে এ ব্যবসা। বহুতল ভবনের নিচতলায় বিশাল গুদাম আর ওপরে মানুষের বসবাস এমন স্থাপনা রয়েছে হাজার হাজার। কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের মতে, গোটা বাংলাদেশের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করা হয় পুরান ঢাকার মজুদ থেকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেমিক্যাল ব্যবসা করতে গেলে কমপক্ষে সরকারি নয়টি সংস্থার ছাড়পত্র অনুমোদন লাগে। প্রথমেই সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স যা অনায়াসে মেলে। অথচ আবাসিক এলাকায় এ ধরনের লাইসেন্স কিছুতেই দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবে দেওয়া হয় লাইসেন্স। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়Ñ নিমতলীর ও আরমানিটোলার মতো ঘিঞ্জি এলাকায়ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র পাওয়া যায়। যা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিলেই পাওয়া যায় এ ধরনের সনদ। এভাবেই নেওয়া হয় কেমিক্যাল কারখানা ও ব্যবসার অনুমোদন।’ তিনি আরও বলেন, ‘টাকা ও প্রভাবের বদৌলতে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। আবার অবৈধভাবে নির্বিঘেœ নিরাপদে ব্যবসা চালাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে।’
আরমানিটোলার মুসা ম্যানশনের পাশের একটি বাড়ির মালিক রমজান আলী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু আরমানিটোলার কথা কেন বলছেন। গোটা কোতোয়ালি, লালবাগ ও সূত্রাপুর থানাজুড়ে এ ধরনের রাসায়নিক কারখানা, গুদাম ও দোকান রয়েছে। এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। নিমতলীর আগুনের পর সিটি করপোরেশনের জরিপে বলা হয়, কমপক্ষে ছোট-বড় ২৬ হাজার ব্যবসায়ী এ পেশায় জড়িত। তারপর চুড়িহাট্টার দুর্ঘটনার পর বলা হচ্ছে এ সংখ্যা কমপক্ষে চার হাজার। আবার গুদাম সরানো প্রকল্পের পরিসংখ্যানে এটা নেমে আসে আড়াই হাজারে। সরকার গত এক যুগেও এটাই হিসাব করে বের করতে পারেনিÑ গোটা পুরান ঢাকায় ঠিক এ ধরনের কত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।’ পুরান ঢাকার আবদুল হাদি লেনের এক বাসিন্দা বলেন, ‘শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপানো ঠিক হবে না। বাড়িওয়ালাদের অতিলোভের বিষয়টিও দেখতে হবে। একজন বাড়িওয়ালা তার রাস্তার পাশে তার বাড়ির নিচতলার ছোট্ট একটা রুম যদি আবাসিক ভাড়াটের কাছে ভাড়া দেন তাহলে বড়জোড় মাসে ১০ হাজার টাকা পান। কিন্তু ওই রুমই যদি কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর কাছে দেওয়া হয় তাহলে ভাড়া আসে তার দ্বিগুণ। এ বাড়তি ভাড়ার জন্য বাড়িওয়ালারা কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দিয়ে গোটা বাড়িটাকেই ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক করে তোলেন। কেউ এর প্রতিবাদও করে না, বিপদও বুঝে না। এভাবেই চলছে যুগ যুগ ধরে। আর এ সুযোগটাই নিচ্ছে থানা পুলিশসহ সরকারের বেশিরভাগ সংস্থা। তাদের ম্যানেজ করেই যুগের পর যুগ এ রাসায়নিকের কারবার চলছে।’
আরমানিটোলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এখন এ ধরনের অবৈধ ব্যবসার বিচার ও তদন্তের দাবি উঠেছে। তাদের একজন হাসান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেমিক্যাল ব্যবসা সরানোর প্রকল্পগুলো যখনই আলোর মুখ দেখে তখনই তারা সক্রিয় হয় এবং প্রভাবশালী মহলের কাছে ধরনা দেয়। রাজনৈতিক স্বার্থ ও ভোটার ঠিক রাখার জন্যই প্রভাবশালীরা তাদের শেল্টার দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি পুরান ঢাকার ছোট-বড় ডজনখানেক নেতার রাসায়নিক কারখানা রয়েছে। তারাও চায় না এগুলো সরে যাক অন্যত্র।’
জানা গেছে, অবৈধ রাসায়নিকের পরিসংখ্যান দেখে নিমতলী ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। ওই সময় সরকারের গঠন করা উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি ১৭ দফা সুপারিশ করেছিল। যার মধ্যে ছিলÑ আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুদ ও বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা। কিন্তু এসব কোনোটারই বাস্তবায়ন করা হয়নি। আরমানিটোলা এলাকাটি ডিএসসিসির অঞ্চল-৪-এর আওতাধীন। এ অঞ্চলের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরান ঢাকায় রাসায়নিক ব্যবসা করার জন্য কাউকেই ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। আগে যাদের দেওয়া হয়েছিল, কয়েক বছর আগে থেকেই তাদের লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রয়েছে। তার মধ্যে মুসা ম্যানশনে দোকান পরিচালনায় সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের ছাড়পত্র ছিল না। এখন নতুন করে কাউকে রাসায়নিক ব্যবসা পরিচালনায় অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে ২০ একর জায়গায় পল্লী স্থাপন করারও কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু দিনের পর দিন ধরেই চলে এসব আলোচনা। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কারণে গুদাম সরানো যাবে না। এগুলো না সরালে প্রায়ই বড় ধরনের অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটবেই। আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, ইসলামপুর, চাঁনখারপুলসহ আশপাশ এলাকার আবাসিক ভবনে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ গুদামগুলো। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বারবার দুর্ঘটনা এড়াতে আমরা কঠোর পদক্ষেপের দিকে যাচ্ছি। কারখানা ও গুদামগুলো সরানোর জন্য যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সেগুলোর বাস্তবায়ন যাতে হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা অনুমতি ছাড়া এসব ব্যবসা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’