দিল্লিতে ঘণ্টায় ১২ জনের মৃত্যু

ভারতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সর্বনাশা সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। আক্রান্তের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। শুধু রাজধানী দিল্লির তথ্যই চমকে ওঠার মতো। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ আগেও দূষণে শীর্ষে থাকার তকমা পাওয়া দিল্লিতে যেখানে ঘণ্টায় গড় মৃত্যু ছিল ৫ জন, চলতি সপ্তাহে তা বেড়ে ১২ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে।

সারা দেশেই অক্সিজেনের জন্য হাহাকার চলছে। তবে দিল্লির হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের অভাবে স্বজনদের চোখের সামনে মারা যাচ্ছেন রোগীরা। করোনা রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার বিকেলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল চলমান লকডাউন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘শহরে করোনার সর্বনাশা পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে দিল্লিতে নমুনা পরীক্ষা   অনুযায়ী শনাক্ত হচ্ছে ৩৭ শতাংশের বেশি। সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু।’

গতকাল দিল্লি সরকার জানিয়েছে, গত ১৯ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় মারো গেছে ১ হাজার ৭৭৭ জন। অর্থাৎ, ঘণ্টাপ্রতি গড়ে ১২ জনের বেশি রোগী মারা গেছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় দিল্লিতে ৩৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত শনিবার নতুন ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জন শনাক্ত হয়েছে। বিশ্বের কোথাও এক দিনে এত রোগী শনাক্ত হয়নি। এ নিয়ে মোট আক্রান্ত দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। শনিবার নতুন ২ হাজার ৭৬৭ জন দিয়ে মোট মৃত্যু ১ লাখ ৯২ হাজার ৩১১ জনে দাঁড়িয়েছে।

এনডিটিভি বলছে, করোনা রোগীর চাপে হাসপাতালের বাইরে ট্রলিতেই বিনা চিকিৎসায় অনেকে মারা যাচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় দিল্লির অনেকগুলো শীর্ষ হাসপাতাল অক্সিজেন সংকটের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছে।

সংক্রমণের শীর্ষে থাকা মহারাষ্ট্রে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৭ হাজার শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার প্রায় ১৭ শতাংশ। মৃত্যুও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এক দিনে কর্নাটকে প্রায় ৩০ হাজার ও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী ও ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির মুখপাত্র নওয়াব মালিক ১৮ বছরের উপরে সবার জন্য বিনামূলে টিকা দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই ঘোষণা দিয়েছেন রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত।

এছাড়া জম্মু ও কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ, কেরালা, ছত্তিশগড়, উত্তর প্রদেশ, আসাম, ঝাড়খণ্ড, পাঞ্জাব, হিমাচল, গোয়া, সিকিম, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও হরিয়ানাতেও ১৮ বছরের উপরে সবাইকে টিকা দেওয়া হবে।

লাগামহীন করোনার মধ্যেও থেমে নেই সরকারি তৎপরতা। অক্সিজেনের হাহাকারকে গুজব আখ্যা দিয়ে টুইটারকে এ-সংক্রান্ত সমালোচনা সরাতে আইনি নোটিস দিয়েছে সরকার। রয়টার্স বলছে, দিল্লির আইনি অনুরোধের ভিত্তিতে বেশকিছু টুইট বার্তা আটকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশে অক্সিজেনের কোনো অভাব নেই দাবি করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ হুমকি দিয়েছেন, এ বিষয়ে কেউ গুজব ছড়িয়ে ‘পরিবেশ নষ্টের’ চেষ্টা করলে জাতীয় সুরক্ষা আইনে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

দ্বিতীয় ঢেউ দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে : গতকাল মন কি বাত অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘অক্সিজেন সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একসঙ্গে কাজ করছে। করোনা আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অযথা ভয় পাবেন না। গুজবে কান দেবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘করোনার প্রথম ঢেউ আমরা সামলেছি। গোটা দেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।’

গতকাল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এক বিবৃতিতে ৫৫১টি অক্সিজেন প্লান্ট তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কেয়ার ফান্ড থেকে প্লান্ট তৈরিতে অর্থায়ন করা হবে। এর মধ্যে এ বছরের মধ্যে ১৬২টি প্লান্টের জন্য ২০১ কোটি ৫৮ লাখ রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ভারতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, ‘ভারতের সরকার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য দ্রুত সহায়তার বিষয়ে পরিকল্পনা করছি।’ অন্যদিকে গতকাল রিয়াদের ভারতীয় দূতাবাসের বরাত দিয়ে সৌদি গেজেট বলেছে, সৌদি আরব দেশটিতে ৮০ টন অক্সিজেন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নভেম্বরে সতর্ক করেছিল বিজ্ঞানীরা : ব্রিটেনের অভিজ্ঞতা দেখে গত নভেম্বরে বিজ্ঞানীরা ভারতে করোনার মারাত্মক দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তবে বিষয়টি আমলে নিয়ে মোদি সরকার প্রস্তুতি নেয়নি বলে খবর দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা।

গত বছর আইসিএমআরের সেরো সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, দেশের জনসংখ্যার প্রতি পাঁচজনে একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ বাকি চারজনেরও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তখনই ছিল। আইসিএমআরের এক বিজ্ঞানীর মতে, ওই গবেষণা থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল, দেশের ১৩৪ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০০ কোটির দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখনই সরকারের উচিত ছিল চিকিৎসা পরিকাঠামোকে প্রস্তুত করা।

কংগ্রেস নেতা রণদীপ সুরজেওয়ালার অভিযোগ, ‘এসব কিছুই মানেনি কেন্দ্র। ফলে অক্সিজেনের অভাবে মানুষকে আজ মরতে হচ্ছে।’