অনেক হাসপাতালেই শয্যা খালি নেই। করোনা আক্রান্ত রোগীর স্বজনরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। অক্সিজেন সংকটে অনেক হাসপতাল আবার ফটক বন্ধ করে রোগী ভর্তি না নেওয়ার নোটিস টানিয়ে দিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি করোনার সংক্রমণের প্রথম ঢেউ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল দেশটিতে। তখন রোগী শনাক্তের সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ গড় ছিল ৯৩ হাজারের আশপাশে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত রবিবার ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন সাড়ে তিন লাখের বেশি, যা যেকোনো দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের নতুন রেকর্ড। দিনটিতে ভারতে মৃত্যুও হয়েছে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের। এসব মৃত্যুর মধ্যে আছে একেবারে চিকিৎসা সেবা না পাওয়া অনেক মানুষও। এদিনও হরিয়ানার দুটি হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছে অন্তত ১৩ জন। এই অবস্থায় দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরোধে সশস্ত্র বাহিনী থেকে গত দুই বছরে অবসরে যাওয়া সব চিকিৎসক আবার কাজে যোগ দেবেন। তারা নিজ নিজ বাড়ির কাছে কভিড হাসপাতালে চিকিৎসা দেবেন। এ ছাড়া দেশটির সামরিক বাহিনীতে থাকা অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোও হাসপাতালে হাসপাতালে সরবরাহ করা হবে। এদিকে এই মুহূর্তে করোনার কেন্দ্রভূমি হয়ে ওঠা ভারতের এই অবস্থায় উদ্বেগ জানিয়ে অনেক দেশই পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডমিটারসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রবিবার ভারতে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫৩১ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদিন দেশটিতে করোনায় মারা গেছেন ২ হাজার ৮০৬ জন।
দেশটিতে পাঁচ দিন ধরে তিন লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তার আগে ১৫ এপ্রিল থেকে দেশটিতে প্রতিদিন দুই লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছিল। আর ছয় দিন ধরে ভারতে দুই হাজারের বেশি মানুষ করোনায় মারা যাচ্ছেন।
ওয়ার্ল্ডমিটারসের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী ভারতে এখন পর্যন্ত করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৭৩ লাখ ৬ হাজার ৩০০। দেশটিতে করোনায় মোট মারা গেছেন ১ লাখ ৯৫ হাজার ১১৬ জন।
ওয়ার্ল্ডমিটারসের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে ভারত। ভারতের পর রয়েছে ব্রাজিল। সংক্রমণের দিক দিয়ে সম্প্রতি ব্রাজিলকে টপকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে ভারত।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত শনিবার ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জনের করোনা শনাক্ত হয়। এদিন মারা যান ২ হাজার ৭৬৭ জন। তার আগের দিন গত শুক্রবার দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়। মারা যান ২ হাজার ৬২৪ জন।
ভারতে করোনার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্রে। তারপর রয়েছে কেরালা, কর্ণাটক, তামিলনাড়–, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ। ছত্তিশগড়, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট ও হরিয়ানার পরিস্থিতিও অবনতিশীল।
করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির মুখে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রাত্রিকালীন কারফিউসহ বিভিন্ন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করায় দেশটি তার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অক্সিজেন, ওষুধ, হাসপাতালে শয্যার সংকটসহ নানা সমস্যায় দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম।
দেশটির হাসপাতালগুলোয় রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানের অনেক হাসপাতালে অক্সিজেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। হাসপাতালগুলো অক্সিজেন চেয়ে জরুরি বার্তা পাঠাচ্ছে।
ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দেশটি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জার্মানিও বলেছে, তারা ভারতকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে আরম্ভ হয়। দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এখনো পিক বা চূড়ায় উপনীত হয়নি। এ কারণে দেশটিতে করোনার সংক্রমণ আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনার এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কবে নাগাদ নিম্নমুখী হতে পারে, সে সম্পর্কে দেশটির বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
এই মহাবিপর্যয়ের জন্য তামিলনাড়– রাজ্যের মাদ্রাজ হাইকোর্ট গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করে মাদ্রাজ হাইকোর্ট কড়া ভর্ৎসনা করে বলেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য একমাত্র দায়ী ভারতের নির্বাচন কমিশন। দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগে নির্বাচন কমিশন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ভারতজুড়ে করোনার এই সংক্রমণ।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ এ কথা বলেছে। এই বেঞ্চের অন্য সদস্য হলেন বিচারপতি সেন্থিল কুমার রামমূর্তি। ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করেছে, ‘এজন্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা হওয়া উচিত।’
এদিকে গতকাল প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান বিপিন রাওয়াত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে জানান, ভারতের সশস্ত্র বাহিনী থেকে গত দুই বছরে অবসরে যাওয়া সব চিকিৎসক আবার কাজে যোগ দেবেন। তবে তারা কাজ করবেন শুধু করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্যই। নিজ নিজ বাড়ির কাছে কভিড হাসপাতালে তারা এ চিকিৎসা দেবেন বলে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান বিপিন রাওয়াত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানান। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, বিপিন রাওয়াত বলেছেন, সামরিক বাহিনীতে অনেক অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের অনেকে এখন অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছেন। তাই এসব সিলিন্ডার হাসপাতালগুলোতে দিয়ে দেওয়া হবে। কারণ অক্সিজেন সিলিন্ডার, জরুরি ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো কালোবাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের অধিকাংশ হাসপাতালে এখন আর শয্যা ফাঁকা নেই। এ কারণে ঘরে বসেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। কিন্তু ঘরে বসেও চিকিৎসা পেতে তাদের দারুণ বেগ পেতে হচ্ছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার, জরুরি ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো কালোবাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। সোমবার বিবিসি অনলাইনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
গতকালও এই অক্সিজেনের অভাবে ফের মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারালেন ১৩ জন করোনা আক্রান্ত রোগী। সোমবার হরিয়ানা রাজ্যের দুটি হাসপাতালে করোনা সংক্রমিত এসব রোগী অক্সিজেনের অভাবে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
এর মধ্যে হরিয়ানা রাজ্যের রেওয়াইয়ার ভিরাট হাসপাতালে মারা যান ৬ জন। পরে গুরুগ্রামের কাঠুরিয়া হাসপাতাল থেকে আরও ৬ জনের মৃত্যুর খবর আসে। যদিও আক্রান্তদের মৃত্যুর কারণ শুধুই অক্সিজেন, নাকি অন্য কিছু? তা জানতে প্রশাসনের তরফে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
এই চিত্র শুধুই হরিয়ানা রাজ্যের একার নয়। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের কভিড হাসপাতালগুলোতে ফুটে উঠেছে অক্সিজেনের ঘাটতি। নেই প্রয়োজনীয় মেডিকেল সরঞ্জামও। দ্রুত সরকারকে এই বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আর্জি জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, নেতা, আমলারা।