ভারত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিধিনিষেধ ৫ মে পর্যন্ত

একবারে তুলে না দিয়ে ধাপে ধাপে চলমান বিধিনিষেধ কঠোর বা সহজ করা হবে। অর্থাৎ অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্যই প্রাথমিক সিদ্ধান্তের পরও আগামী বৃহস্পতিবার থেকে গণপরিবহন চালু করা হচ্ছে না। খোলা হচ্ছে না সরকারি বেসরকারি অফিসও। চলমান বিধিনিষেধ আগামী ৫ মে পর্যন্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা থেকে। গতকালই এই সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদিত হলে আজ মঙ্গলবার অফিস আদেশ জারি করা হবে। 

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যখন বৈঠক করি তখন সব বিষয়ই বিবেচনায় নিই। ঈদের জন্য ব্যবসায়ীরা অনেক বিনিয়োগ করে থাকেন। এসময় বিধিনিষেধে বন্দি করা হলে তাদের বিনিয়োগ আটকে যাবে। মালিকসহ তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন তাদের পরিবার ভয়াবহ আর্থিক কষ্টে পড়বে। আমাদের অর্থনীতির চাকাও সচল রাখতে হবে আবার বিধিনিষেধের মধ্যেও থাকতে হবে। দোকানে যেমন কর্মচারী রয়েছে তেমনি বাসেও রয়েছে ড্রাইভার, হেলপার-কন্ডাক্টর। তাদেরও পরিবার আছে। এই বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আগামী বৃহস্পতিবার থেকে গণপরিবহন চালুর কথা ছিল। কিন্তু গণপরিবহন চালু করলে কী হবে? ভিড়বাট্টা আরও বেড়ে যাবে। এখন যাদের বের না হলেই নয়, তারা বের হচ্ছেন। আর গণপরিবহন খুলে দিলে সবাই বের হয়ে পড়বেন। তাছাড়া সীমান্তবর্তী জেলার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও রয়েছে। আন্তঃজেলা বাস চালু হলেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে লোকজন ঢাকায় চলে আসবে। আমরা ভারতের কভিড পরিস্থিতিতে গভীর দৃষ্টি রাখছি। গতকালও এ বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কলকাতায় এখানো পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়নি। কলকাতায় দিল্লির মতো পরিস্থিতি হলে আমাদের আবারও কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে যেতে হবে। কাজেই সহসা আমরা আর বিধিনিষেধ মুক্ত হতে পারছি না। সার্বিক অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ই চিন্তা করছে কীভাবে এই সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়। এই ভাবনা থেকেই সরকার ৩৩৩ চালু করেছে। এখানে ফোন দিলে খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা এটা কত দিন চালু রাখতে পারবে, সেটা একটা বড় বিষয়। মাঠে টিআর কাবিখা চলছে। ঈদে ভিজিএফ দেওয়া হবে। সরকার নগদ সহায়তা দিচ্ছে। সবকিছু মিলেই আমাদের এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে দোকানপাট ও শপিংমল খোলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শপিংমল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কোনো রকম সমন্বয় ছাড়াই তা রাত ৯টা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা আসে। এই বাড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের কোনো যোগসূত্র নেই। গতকাল নতুন করে সিদ্ধান্ত হয়েছে ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শপিংমল বা দোকানপাট খোলা রাখা যাবে। ৬ মে থেকে গণপরিবহন চলতে পারে। তবে সরকারি অফিস না খোলার সম্ভাবনাই বেশি। অর্থাৎ চলমান ছুটি ঈদের ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।

কভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে গত ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে আট দিনের বিধিনিষেধ শুরু হয়। লকডাউনের মধ্যে পালনের জন্য ১৩টি নির্দেশনা দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। সেই মেয়াদ শেষ হয় গত ২১ এপ্রিল মধ্যরাতে। তবে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বিধিনিষেধের মেয়াদ ২৮ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গতকাল অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তা আবার ৫ মে পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তারই আজ অফিস আদেশ জারি করা হবে। 

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল সাংবাদিকদের জানান, সার্বিক করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের এই বিধিনিষেধ চালিয়ে যেতে হবে। সরকার সেই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। যে অবস্থাটা আছে সেটাই আরও এক সপ্তাহ অব্যাহত থাকবে। তবে দোকানপাট, শপিংমল সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কেট খোলা রাখতে হচ্ছে, তাদের এখানে বড় ধরনের বিনিয়োগের বিষয় রয়েছে। এখন মার্কেট ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকছে, সেটা এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত করা হবে। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট ও দোকান পরিচালিত হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

ফরহাদ হোসেন আরও জানান, ভারতের কভিড পরিস্থিতি তো খুবই খারাপ হয়ে গেছে। ভারতে যে ধরনের করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে তা যদি এখানে ছড়িয়ে পড়ে, এর মধ্যে যদি আবার আমাদের এখানে সবকিছু খুলেও দেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

বর্তমানে ১৩ দফা বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। প্রথমেই রয়েছে অফিস ও কর্মস্থলে উপস্থিতি সংক্রান্ত। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ রয়েছে। প্রথম ব্যাংক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা পরিবর্তন করা হয়েছে।  বিধিনিষেধ চলার সময় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করার কথা থাকলেও বেশিরভাগই কর্মচারী কর্মস্থলে নেই। বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে।

সড়ক, নৌ ও রেল বন্ধ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট বন্ধ থাকার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে দফায় দফায় পরিবর্তন এসেছে। শিল্প-কারখানা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু রয়েছে। শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় যানজট দেখা যাচ্ছে।