চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ট্রাকচালক আজিজুলকে অপহরণের পর হত্যা ও মরদেহ গুমের রহস্য উন্মোচন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার এক মাস পর গত শনিবার গভীর রাতে পারুয়া ইউনিয়নের একটি ডোবার মাটি খুঁড়ে আজিজুল হকের (২৭) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর আগে একই দিন দুপুরে ঘটনার ‘মূল হোতা’ মো. নেজাম ওরফে মিজানকে (২৬) সন্দ্বীপ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার নেজাম রাঙ্গুনিয়ার পোমরা হাজীপাড়া এলাকার নুরুল আলমের ছেলে।
পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নেজাম তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজিজুলকে হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনার বীভৎস বর্ণনা দিয়েছে। মূলত পারিবারিক শত্রুতার জের ধরেই এই হত্যার পরিকল্পনা করেন নেজাম। ঘটনার দিন বালু আনার নাম করে আজিজুলকে কৌশলে রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া এলাকার এক নিভৃত জায়গায় নিয়ে গিয়ে ট্রাকের রেঞ্জ দিয়ে মাথায় আঘাত করে এবং ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন তিনি। হত্যার পর একদিন পাহাড়ে লাশ লুকিয়ে রাখার পর বন্ধু আজিজুলের জানাজা ও দাফন করার চিন্তা মাথায় আসে নেজামের। সে অনুযায়ী ২৬ মার্চ রাতে তিনি লাশটিকে কাঁধে করে রাঙ্গুনিয়ার চৌধুরীখিলের নাজিম প্রফেসরের পাহাড়ের পাদদেশে একটি ডোবার সামনে নিয়ে আসেন। সেখানে নেজাম একাই মরদেহের জানাজা পড়েন এবং কবর দেওয়ার মতো করে ডোবার তলদেশে লাশটিকে গুম করেন।
জানা যায়, গত ২৫ মার্চ রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ইউনিয়নের আল আমিন পাড়া গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে ট্রাকচালক আজিজুল হক (২৭) নিখোঁজ হন। পরদিন তার বাবা রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় একটি জিডি করলে বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। এরমধ্যে গত ৬ এপ্রিল আজিজুলের মামা হায়দার আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি অপহরণ মামলা করেন। তদন্তে আজিজুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি কক্সবাজারে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে প্রযুক্তির সাহায্যে নিশ্চিত হয় পুলিশ। ঘটনার ১৫ দিন পর ওই সূত্র ধরে কক্সবাজার সদর এলাকা থেকে আজিজুলের মোবাইলটি এবং রামু এলাকা থেকে তার ট্রাকটি জব্দ করা হয়। এছাড়া তাকে অপহরণকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ওই এলাকার দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা আজিজুল হত্যায় নেজামের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে। এরপর পুলিশ প্রযুক্তির সাহায্যে তার অবস্থান সন্দ্বীপে শনাক্ত করে এবং গত শনিবার সন্দ্বীপ থানা পুলিশের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার হওয়ার পর হত্যার কথা স্বীকার করলেও হত্যার পদ্ধতি এবং লাশের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে থাকেন নেজাম। প্রথমে তিনি দাবি করেন যে, আজিজুল সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এবং তার লাশ কর্ণফুলী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রমাণ এবং প্রশ্নবাণের মুখে শেষ পর্যন্ত নিজে খুন করার কথা এবং লাশের সঠিক অবস্থান জানাতে বাধ্য হন তিনি। পরে তার দেখানো জায়গা থেকে আজিজুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর গত রবিবার নেজামকে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আঞ্জুমান আরার আদালতে তোলা হলে তিনি ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে আজিজুলকে হত্যা ও গুমের ঘটনার রোমহষর্ক বর্ণনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি নিজ স্ত্রীর সঙ্গে আজিজুলের পরকীয়ার সন্দেহ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরিকল্পনা করেন বলে জবানবন্দিতে দাবি করেন।
এ প্রসঙ্গে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান সার্কেল মো. আনোয়ার হোসেন শামীম বলেন, ‘প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘ এক মাসের নিরবচ্ছিন্ন এবং নিবিড় তদন্তে আমরা প্রায় কোনো ক্লু না থাকা এই ঘটনাটির রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছি। সেই মোতাবেক ঘটনার মূল হোতা নেজামকে গ্রেপ্তার এবং এবং তার দেওয়া তথ্যমতে ভিকটিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না তা নিরূপণের জন্য তদন্ত অব্যাহত আছে।’