ভারতে দৈনিক শনাক্ত সাড়ে চার লাখের দিকে!

ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত ও মৃত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দেশটিতে দৈনিক আক্রান্ত টানা ছয় দিনের মতো তিন লাখ পার করেছে। টানা সাত দিনের মতো মৃত্যুর সংখ্যা পার করেছে দুই হাজার। এমন অবস্থায় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের এক গবেষণার বরাতে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে একজন করোনা রোগীর কাছ থেকে ৩০ দিনে সংক্রমিত হতে পারে আরও ৪০৬ জন। সে ক্ষেত্রে করোনার আরও ভয়ংকর রূপ অপেক্ষা করছে দেশটির সামনে। বর্তমান সংক্রমণের হার ও সার্বিক পরিস্থিতির মাধ্যমে গণনা করে দেশটির আইআইটির গবেষকরা জানিয়েছেন, দেশটিতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ শীর্ষে পৌঁছাবে মে মাসে। সে ক্ষেত্রে আগামী ৪ থেকে ৮ মে  সময়কালে ৪ লাখ ৪০ হাজারে উঠতে পারে দৈনিক শনাক্ত। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, টেস্টের সংখ্যা কম হলেও গত সোমবার ভারতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২ হাজার। একই সময়ে মারা গেছেন ২ হাজার ৭৬৬ জন।

মহামারীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন ভারতে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ মাসে ৩৪ হাজার ৫৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু গত সাত দিনেই মারা গেছেন ১৭ হাজার ৩৩৩ জন। এর আগে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী মাস ছিল গত বছরের সেপ্টেম্বর। সেই মাসে মারা যান ৩৩ হাজার ২৩০ জন। তার আগের মাস আগস্টে মারা যান ২৮ হাজার ৯৫৪ জন।

বিশ্বে এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যায় এখন ভারত। এর আগে ব্রাজিলে এক মাসে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। চলতি বছরের মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ছয় গুণ বেড়ে গেছে, গত মাসে মারা যান ৫ হাজার ৬৫৬ জন।

করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করা দেশটি তার স্বাস্থ্যখাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অক্সিজেন, ওষুধ, হাসপাতালে শয্যার সংকটসহ নানা সমস্যায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম।

ভারতের হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশিরভাগ হাসপাতালে অক্সিজেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। হাসপাতালগুলো অক্সিজেন চেয়ে জরুরি বার্তা পাঠাচ্ছে।

ভারতে করোনার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্রে। তারপর রয়েছে কেরালা, কর্ণাটক, তামিলনাড়–, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ। ছত্তিশগড়, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট ও হরিয়ানার পরিস্থিতিও অবনতিশীল।

করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির মুখে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রাত্রিকালীন কারফিউসহ বিভিন্ন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

ভারতে গত ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানে। দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এখনো পিক বা চূড়ায় ওঠেনি। ফলে দেশটিতে করোনার সংক্রমণ আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনার এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কবে নাগাদ নিম্নমুখী হতে পারে, সে সম্পর্কে দেশটির বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।

এদিকে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে একজন করোনা রোগীর কাছ থেকে ৩০ দিনে সংক্রমিত হতে পারেন আরও ৪০৬ জন। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের এক গবেষণার ভিত্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক, কেরলা, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, গুজরাট ও তামিলনাড়–তে সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা লক্ষাধিক।

নীতি আয়োগের সদস্য ড. ভিকে পাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই করোনা আবহে দয়া করে অকারণে বাড়ি থেকে বের হবেন না। পরিবারের মাঝেও মাস্ক পরে থাকুন। মাস্ক পরা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজের বাড়িতে অন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানাবেন না।’

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় বলেও উল্লেখ করেন ড. ভিকে পাল।

এদিকে আইআইটির গবেষকরা জানিয়েছেন, দেশটিতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ শীর্ষে পৌঁছাবে মে মাসে। আগামী ৪ থেকে ৮ মে দৈনিক ৪ দশমিক ৪ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর আগে এই গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেই ১৫ এপ্রিল সংক্রমণ শীর্ষে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিলেন তারা। আইআইটি কানপুর ও আইআইটি হায়দরাবাদের গবেষকরা এসইউটিআরএ মডেল ব্যবহার করে এই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

তবে বর্তমান পরিসংখ্যান প্রয়োগ করে আবারও নতুন করে হিসাব করেছেন গবেষকরা। আর তাতেই উঠে আসছে ভয়ানক তথ্য। দেখা যাচ্ছে, আগামী ৪-৮ মে’র মধ্যে ভারতে দৈনিক ৪ লাখ ৪০ হাজারের বেশি সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।

এসইউটিআরএ মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেই গত বছর আগস্টে প্রথম পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে বলা হয়েছিল যে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শিখরে পৌঁছাবে করোনা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে একটু কমতে পারে সংক্রমণ।