হেফাজতে ইসলামের অর্থ জোগানদাতা ৩১১ জনকে চিহ্নিত করার তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল মঙ্গলবার ডিএমপি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাদ্রাসার উন্নয়নের কথা বলে বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। হেফাজতকে টাকা দিয়ে আসছেন এমন ৩১১ জন অর্থদাতার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ওইসব অর্থ সত্যিই মাদ্রাসার উন্নয়নে খরচ হয়েছে কি না তা জানতে তদন্ত চলছে। একই করা হয়েছে তা জানতে আমরা তদন্ত করে যাচ্ছি।
সঙ্গে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের দুটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এছাড়া মামুনুলের কথিত দ্বিতীয় জান্নাত আরা ঝর্ণাকে মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমরা ৩১১ জনের নামের একটি তালিকা তৈরি করেছি, যারা কওমি মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য নিয়মিত টাকা দিত। সেই টাকা মাদ্রাসার উন্নয়ন কাজেই ব্যবহার হতো নাকি দেশজুড়ে নানা সময় যেসব সহিংসতা হয়েছে সেগুলোতে ব্যবহার পাশাপাশি ওই ৩১১ জন অথর্দাতার অনুদানের উদ্দেশ্য ও তাদের অর্থের উৎসও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিবির প্রধান বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া হেফাজত নেতা মামুনুল হকের দুটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। সাত দিনের রিমান্ড শেষ আদালতে মামুনুল স্বীকারোক্তি দেননি কেন জানতে চাইলে হাফিজ আক্তার বলেন, ‘স্বীকার করা না করা এটা তার ব্যাপার, আমরা তদন্ত করে যা তথ্যপ্রমাণ পাব সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আসা এই অর্থের উৎস খোঁজা হচ্ছে।’
হেফাজতে শফীপন্থিদের সরিয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে হাফিজ আক্তার বলেন, ‘জুনায়েদ বাবুনগরীর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে মামুনুল হক, জুনায়েদ আল হাবিবসহ কয়েকজন নেতার বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে আল্লামা শফীকে সরিয়ে দিয়ে জুনায়েদ বাবুনগরীকে হেফাজতের আমির করার পরিকল্পনা হয়।’
গত ১৮ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে দুই দফায় তাকে ৭ দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গত সোমবার শাপলা চত্বরে সহিংসতার মামলায় ৪ দিন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় সহিংসতার একটি মামলায় আরও ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল ছিল দ্বিতীয় দফা রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন।
এর আগে গত ২৫ এপ্রিল ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশীদ জানান, মামুনুলের সঙ্গে পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তিনি দেশে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টায় ছিলেন। তিনি হেফাজতকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেন। এলক্ষ্যে মামুনুল প্রায় ৪৫ দিন পাকিস্তানে ছিলেন। সেখানকার একটি রাজনৈতিক দলের কাঠামো সংগ্রহ করেন। যেটি মামুনুল পরে হেফাজতে প্রয়োগের চেষ্টা করেন।
ঝর্ণাকে উদ্ধার : হেফাজতে ইসলামের সদস্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হকের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণাকে উদ্ধার করেছে ডিবি পুলিশ। ঝর্ণার ছেলে আব্দুর রহমান ও বাবা ওয়ালিউর রহমানের করা জিডির প্রেক্ষিতে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে ঝর্ণাকে উদ্ধার করে।
গত ১১ এপ্রিল রাতে ঝর্ণার বড় ছেলে আব্দুর রহমান রাজধানীর পল্টন থানায় একটি ডিজি করেন। এছাড়া গত সোমবার ঝর্ণার বাবা মেয়েকে উদ্ধারের জন্য কলাবাগান থানায় আরেকটি জিডি করেন। এরপরই গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল জান্নাত আরা ঝর্ণার অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। তবে গত শনিবার ঝর্ণার বাবাকে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানা পুলিশের মাধ্যমে ঢাকায় নিয়ে আসে ডিবি পুলিশ। তার এক দিন পর সোমবার তিনি কলাবাগান থানায় ডিজি করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে মোহাম্মদপুরের একটি বাসায় ঝর্ণাকে আটক রাখা হয়েছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়। ওই বাসাটি মামুনুল হকের বোন দিলরুবার বাসা বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ডিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, ঝর্ণাকে উদ্ধারের পর তার আইনগত অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে অবস্থানকালে স্থানীয় জনতার হাতে অবরুদ্ধ হন মামুনুল। পরে তাকে হেফাজত কর্মীরা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় সোগারগাঁ থানার ওসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে বায়তুল মোকাররম এলাকায় সহিংসতা হয়। পরে ডাকা হরতাল ও বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের তা-বে ১৭ জন নিহত হয়। এসব ঘটনায় ঢাকায় ১২টি মামলা করা হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতা নাশকতার ঘটনায় মোট ৫৩টি মামলা হয়। মোট ৬৪টি মামলা তদন্তাধীন আছে। এ পর্যন্ত হেফাজতে ইসলামের ১৬ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। তাদের দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে রবিবার হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ৫ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।