মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলোতে জাতিগত সশস্ত্র বিভিন্ন বাহিনীর কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেওয়া নতুন বাহিনী ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্সের সদস্যরা। গতকাল মঙ্গলবার ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্সের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে দেশটির গভীর জঙ্গলে বানানো মাঠে শতাধিক তরুণ-তরুণী জগিং করছেন। তারা বার্মিজ ভাষায় দেওয়া সেøাগানে বলছেন, ‘জনগণের জন্য’ লড়াই করতে তারা প্রস্তুত।
এদিকে এই ভিডিও প্রকাশের দিনই দেশটির পূর্বাঞ্চলে থাই সীমান্তের কাছে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংখ্যালঘু কারেন জাতিগোষ্ঠীর বিদ্রোহীদের তুমুল লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বিদ্রোহীরা একটি সেনাঘাঁটিতে হামলা করলে দুইপক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়। মিয়ানমারে গত ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর সঙ্গে কারেন বিদ্রোহীদের যত লড়াই-সংঘাত হয়েছে, তার মধ্যে গতকালের সংঘাত ছিল সবচেয়ে তীব্র। তবে এখনো এই সংঘাতে কোনো হতাহতের খবর মেলেনি।
ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্স নামের এই বাহিনীটির প্রশিক্ষণের খবর দিয়ে রয়টার্স পৃথক এক প্রতিবেদনে বলেছে, সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়াদের অনেকেই দমনপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছেন। অবশ্য তাদের দেওয়া ভিডিওতে ব্যায়াম ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দৃশ্য থাকলেও অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণের কিছু দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ভিডিওতে যুদ্ধের পোশাক পরা একজনকে তরুণদের ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ দিতে দেখা গেছে। এ সময় বেশিরভাগ প্রশিক্ষণার্থীর পরনেই ছিল কালো পোশাক।
‘কী করছো তোমরা?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তরুণদের সম্মিলিতভাবে ‘আমরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছি’ বলতে শোনা গেছে। ‘কেন করছো?’, ‘কাদের জন্য?’ এসবের উত্তর এসেছেÑ ‘যুদ্ধ করতে’, ‘জনগণের জন্য’।
ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মোন মোন বলেন, আমরা এখানে তিন মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে এসেছি, আমাদের সবার একটাই লক্ষ্য, বিপ্লব। এখানে আসা বেশিরভাগেরই বয়স ২০-এর ঘরে, বেশিরভাগই ছাত্র। ৩৫, ৪০ বছরেরও অনেকে আছেন, তবে সবচেয়ে বেশি জেড প্রজন্মের।
গত শতকের শেষ দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে চলতি শতকের প্রথম দশকে জন্ম নেওয়াদের অনেক গণমাধ্যমেই ‘জেনারেশন জেড’ বা ‘জেড প্রজন্ম’ ডাকা হয়।
মোন মোন জানিয়েছেন, এখন তাদের প্রশিক্ষণে ২০ নারীসহ প্রায় ২৫০ জন অংশ নিচ্ছেন। মিয়ানমারজুড়ে তাদের সংগঠনের সদস্য প্রায় এক হাজার বলেও দাবি করেছেন তিনি। তাদের এ সশস্ত্র প্রশিক্ষণ কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকায় হচ্ছে, জানান এ নারী।
মিয়ানমারে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দশকের পর দশক ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া দুই ডজন জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীর একটি হচ্ছে কেএনইউ।
তাদের এলাকায় ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্সের সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে কিনা, তা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করতে রাজি হননি কেএনইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান পাদো সাও।
মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের সীমান্তের কাছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক লড়াইয়েরও খবর পাওয়া গেছে।
কেএনইউ জানিয়েছে, তারা ওই এলাকায় একটি সামরিক চৌকির দখল নিয়েছে। এ বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে সেনাবাহিনীর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ডকে পৃথক করেছে এই নদী। নদীর থাইল্যান্ড অংশের গ্রামবাসীর ভাষ্য, আজ সূর্যোদয়ের আগেই নদীর মিয়ানমার অংশে তুমুল গোলাগুলি শুরু হয়।
সংঘাতের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বনভূমিঘেরা পাহাড়ের পাশ দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয় অং সান সু চিসহ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের। তারপর থেকে দেশটিতে তুমুল বিক্ষোভ চলছে। চলমান এই বিক্ষোভে মিয়ানমারের সেনা-পুলিশের গুলিতে এখন পর্যন্ত শিশুসহ সাত শতাধিক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছেন সাংবাদিক, শিল্পীসহ তিন সহস্রাধিক বিক্ষোভকারী।