তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলায় হাঙ্গেরির শিক্ষার্থীরা

কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যার দিক দিয়ে সবার ওপরের দেশ হাঙ্গেরি। একের পর এক ধাক্কায় বিপর্যস্ত চিকিৎসা খাত সচল রাখতে জরুরি অধ্যাদেশ জারি করে দেশটি সদ্য গ্র্যাজুয়েট থেকে শুরু করে, ৫ম-৬ষ্ঠ বর্ষে পড়া ডাক্তার, নার্সদের নামিয়ে দেয় করোনাযুদ্ধে। হাঙ্গেরিতে কভিডের তৃতীয় ঢেউ নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

তৃতীয় ঢেউ

বিশ্বে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হারে সবচেয়ে এগিয়ে আছে হাঙ্গেরি। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনাভাইরাস রিসার্চ সেন্টারের চলমান গবেষণায় উঠে আসে দেশটির মৃত্যুর হার ৩.৫%, যার অর্থ প্রতি লাখে মৃতের সংখ্যা ২৭৪ জন। গত বছর মার্চের শেষভাগে করোনা তার সর্বশক্তি দিয়ে হাঙ্গেরির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গ্রাস করতে চাইলে সরকারের নির্দেশে এগিয়ে আসে মেডিকেল কলেজের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। গত বছর নভেম্বরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে ধাক্কা দিলে বাড়তেই থাকে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সংখ্যা। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই এখন হাঙ্গেরিতে করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ চলছে।

স্বাস্থ্য খাতকে চাঙ্গা রাখতে রেজিস্টার্ড ডাক্তার ও নার্সের পাশাপাশি সরকারি নির্দেশে স্বাস্থ্যসেবার শিক্ষার্থীদের কাজে নামতে হয়। মহামারীর প্রথম ঢেউয়ে ২০২০ সালে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে হাঙ্গেরির মানবসম্পদমন্ত্রী মিকলোস কাসলার ষষ্ঠ বর্ষে পড়া সব ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের উদ্দেশ্য করে চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে জানানো হয়, বিভাগীয় ক্ষমতাবলে আমি আপনাদের জানাচ্ছি, দেশের প্রয়োজনে সব হবু স্বাস্থ্যকর্মী মহামারীর সময়ে কাজ করতে বাধ্য।

ঠিক এর তিন মাস পরে দেখা গেল কেবল সদ্য পাস করে বের হওয়া ডাক্তারই নয়, পরিস্থিতি সামলাতে দেশটির আরও লোকবল দরকার। একই বছরে জুনের ১৮ তারিখে এলো নতুন স্বাস্থ্যনীতি। এ দফায় দেখা গেল মাধ্যমিক, কারিগরি শিক্ষা, স্নাতকের শিক্ষার্থী, ঝরেপড়া শিক্ষার্থী কিংবা যাদেরই প্রাথমিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞান রয়েছে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে অনির্দিষ্টকালের জন্য দ্বিতীয় দফায় স্বেচ্ছাসেবক আহ্বান করা হয়েছে এবং এই অধ্যাদেশ বলে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোনো সম্মতি না নিয়েই তাদের ডিউটিতে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী যাদের মূল পাঠ্যসূচির বড় অংশ জুড়ে স্বাস্থ্যসেবা ছিল, তাদের অন্তর্ভুক্ত করে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের সব শাখার স্বেচ্ছাসেবকদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। কভিড-১৯ পরিস্থিতি সামলাতে তাদেরও কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।

করোনার ঊর্ধ্বগতির সময়ে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ছিল রোগীর যত্ন ও সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে রাখা। সে সময় সময়ের হিসাবকে ভাবনার ঊর্ধ্বে রেখেই ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা সব সামলে গিয়েছেন। করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের ভয়াবহতার মাত্রা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে হাঙ্গেরির স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, বিশেষ করে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের শারীরিক ও মানসিক দুর্দশার বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। এতদিন রোগীর দেখভালের চাপে নিজেদের যত্ন নেওয়ার সময় পাননি। এতদিনে নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সময় মিলল তাদের।

মৃত্যুকে মোকাবিলা

হাঙ্গেরির স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে শক্ত হাতে লড়াই না করলে মৃতের হার আরও বেড়ে যেত। অগণিত রোগীকে সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছেন তারা। কিন্তু দিনরাতের এই অবিরাম চ্যালেঞ্জ তাদের মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। রোগীর জন্য না হয় ডাক্তার রয়েছে, ডাক্তারের জন্য কে আছে?

হাঙ্গেরির শীর্ষস্থানীয় রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন এইচভিজিকে একজন স্বেচ্ছাসেবক বলেছিলেন, ‘করোনা ইউনিটে থাকাকালীন পিপিই পরা অবস্থায় আমাদের আপাদমস্তক ঢাকা থাকে। এ অবস্থায় শ্বাস নেওয়াই কঠিন। প্লেক্সিগ্লাস, ফেস শিল্ড ও চশমা কিছুক্ষণ পরপরই ঘোলাটে হয়ে যায়। তাই আমরা তিন ঘণ্টা পর পর এগুলো বদলে ফেলতাম।’

রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চারটি অংশ রয়েছে। গ্রিন, ইয়েলো, অরেঞ্জ ও রেড জোন। সবচেয়ে সংকটাপন্ন রোগীদের রাখা হয় রেড জোনে। প্রতিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নার্স ও ডাক্তারদের সহায়তা করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের পাঠানো হয়েছে। হাঙ্গেরির একটি ক্লিনিকের রেড জোনে কর্তব্যরত একজন স্বেচ্ছাসেবকের বক্তব্য থেকে জানা যায়, তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নার্স ও ডাক্তারেরা এত সময় ধরে ডিউটি করে যাচ্ছেন। কতক্ষণ ডিউটি দিতে হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ডাক্তারদের অনেকেই প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে ডিউটি করছেন। মাসে মাত্র চারদিন ছুটি মিলছে তাদের।

যখন পঞ্চম বর্ষের আরেকজন ছাত্রকে এইচভিজির পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, হাসপাতালে কাজ করার অভিজ্ঞতার সবচেয়ে কঠিন অংশটি কী। তখন কোনোরকম দ্বিধাবোধ ছাড়াই তিনি বলেন, ‘মৃত্যুপথযাত্রী মানুষদের যত্ন নেওয়ার কাজ ছিল ভীষণরকম কঠিন। বিশেষ করে যে রোগীরা শেষ সময়ে বুঝতে পেরেছিলেন তারা মারা যাচ্ছেন। এই মৃতপ্রায় লোকদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় আমার বারবার মনে পড়ত তারা কীভাবে নিজের বাড়িতে আয়েশে বসে থেকে প্রতিনিয়ত ভাইরাসের তীব্রতা ও ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে গেছে।’

হাসপাতালগুলোর রূপান্তর

সরকারি অফিস থেকে স্বাস্থ্যসেবার ছাত্রদের ফোন দিয়ে এক একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে কাজ করতে বলা হয়। স্বাস্থ্যসেবার একজন সিনিয়র ছাত্রের তথ্যমতে, ‘বর্তমান পরিস্থিতির অংশ হওয়া ও হাসপাতালে কাজ করার অভিজ্ঞতা দুটোই বেশ কঠিন।’ মেডিসিন, নার্সিং, ফিজিওথেরাপি, নিউট্রিশন, পাবলিক হেলথ ও ল্যাব ডায়াগনস্টিক্সের মোট ২০ জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে জড়ো হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। ওদিকে হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার চাপে স্বেচ্ছাসেবকদের কর্মঘণ্টাও বাড়তে থাকে। কর্মক্ষেত্রে এসে তারা দেখেন ডিউটির নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ৮ ঘণ্টা নয়, অনেকগুলো দিন তারা ১২ ঘণ্টা কাজ করেও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।

তিনি আরও জানান, ‘হাসপাতালের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট যেমন পালমোনোলজি, নিউরোলজি ও সেপ্টিসেমিয়া সবগুলোকে কভিডের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এমনকি জরুরি অপারেটিং রুম পর্যন্ত রূপান্তরিত হয়েছিল এক একটি কভিড ওয়ার্ডে।’ পরিস্থিতি দেখলে মনে হতে পারে হাসপাতালের আলাদা আলাদা ডিপার্টমেন্টের প্রয়োজনীয়তা যেন ফুরিয়েছে। পুরো হাসপাতালটিকে একটি বিশেষায়িত কভিড ইউনিট বানিয়ে ফেলা গেলেই বুঝি কমবে মৃতের সংখ্যা।

নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে তিনি বলেন, ‘সুস্থ একজন মানুষের অক্সিজেন সংকটে পড়ে মৃত্যুপথযাত্রী হিসেবে দেখার বিষয়টি যে কাউকে ভীষণ কষ্টে ফেলে দেবে। আবার শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকলে রোগীরা খুব আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। মাঝেমাঝে তারা নার্সদের আক্রমণ করে বসেন, আইসিইউ বেডের যন্ত্রপাতি নষ্ট করে ফেলেন, হ্যালুসিনেশনে পড়ে ভুলভাল বকা শুরু করেন, অনেক সময় আবার পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়েন। আগে থেকে কিছু অনুমান করা যায় না। সম্পূর্ণ পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’

করুণ অভিজ্ঞতা

নার্সিং ছাত্রদের অভিজ্ঞতায় হাসপাতালে কাজ করা নিয়ে ভয়াবহ নানা অভিজ্ঞতা আছে। একজন ছাত্র জানান, ‘আমি আজকের শিফট শুরু করেছিলাম ঠিক আগের মতো। একটু দূরে থাকা বাথরুমে কাপড় পরিবর্তন করেছি। এরপরে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলাম যেখানে আমরা আমাদের জিনিসগুলো রেখেছিলাম। রান্নাঘরের দরজা খুলতেই বুঝলাম এটি আর আগের অবস্থায় নেই। জায়গার অভাবে মুহূর্তেই এটিকে ওয়ার্ড বানিয়ে ফেলা হয়েছে। রান্নাঘরে থাকা দুটো টেবিল আর দেয়ালের পাশে আমাদের ব্যাগ, কোট এবং থাকার জন্য পাঁচটি বিছানা পাতা ছিল। এখন সেই পাঁচটি বিছানাই চলে গেছে রোগীর দখলে। ছোট্ট একটা ঘরে এত ভিড়! নড়াচড়া করতে গেলেই মনে হতো যুদ্ধ করতে চলে এসেছি। যেহেতু আর কোনো ভালো উপায় ছিল না তাই আমি ডায়াপার ও জীবাণুনাশকের পাশের একটি আলমারিতে আমার ব্যাগ রেখে দিলাম। আমি হাসপাতালের ট্রায়েজ রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণ আগেই একজন রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়েছিল। বুঝতে পারলাম সেই অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হয়েছে। কাছে যেতেই দেখা গেল অ্যাম্বুলেন্সে ৪৪ বছর বয়সী একজন নারী অচেতন অবস্থায় স্ট্রেচারে পড়ে আছেন। রোগী মৌখিক কোনো কথা বলে বা ব্যথায় কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। সাড়া না পেয়ে তার মুখে ও শ্বাসনালিতে নল লাগাতে হলো। ইসিজিতে খারাপ কিছু পাওয়া গেল না। তাই ভেবে নিলাম কভিড-১৯ সংক্রমণের সম্ভাবনা নেই। কী সমস্যা থাকতে পারে সেটা খুঁজতে শুরু করলাম।

আমরা নীরবে আমাদের কাজ করে যাচ্ছিলাম। রোগীকে শুইয়ে দেওয়ার বিছানা তৈরির পরে তার শিরায় ব্র্যানুলার লাগিয়ে দিলাম। তার রক্ত পরীক্ষার জন্যে টেস্টটিউব, মনিটর, ভেন্টিলেটর প্রস্তুত করছি। সিটি স্ক্যান করতে হতে পারে তাই ল্যাবকে প্রস্তুত থাকতে বলে দিলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত না জানা যাচ্ছে রোগী কেন সাড়া দিচ্ছেন না ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন কোনো রোগীর দিকে মনোযোগ দেওয়া যাবে না। বিস্ময়করভাবে দেখলাম রোগী আসার পরে এই কাজগুলো করতে মাত্র সাড়ে চার মিনিট সময় লেগেছে। নিও-নরমালের প্রটোকল অনুযায়ী, যেকোনো রোগীর কভিড-১৯ টেস্ট বাধ্যতামূলক। পরীক্ষা করা হলে দেখা গেল রোগীর কভিড নেগেটিভ। কিন্তু রোগী তখনো কোনো সাড়া দেননি। আমরা তাকে একটি সিটিস্ক্যান করতে পাঠিয়ে দিয়েছি যেখানে তারা কিছুই পায়নি। পরামর্শের জন্য একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞকে ডাকা হলো। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ দেখতে পান যে, রোগীর মস্তিষ্ক আর কোনোভাবেই কাজ করতে সক্ষম নয়। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম আমরা একজন ৪৪ বছর বয়সী ব্রেন-ডেড রোগীর সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলাম। কীভাবে তাকে সাহায্য করা যায় সে সম্পর্কে আমাদের কারও কোনো ধারণা ছিল না। আমরা তাকে আবার মাথা-ঘাড় সিটিস্ক্যান করতে পাঠালাম তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হয়েছে কি না তা দেখার জন্য। কিন্তু মস্তিষ্কে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। পরিশেষে, কোনো উপায় না পেয়ে আমরা ল্যাবের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ফুসফুসের সিটিস্ক্যান করতে বলেছিলেন। সিটিস্ক্যান রিপোর্টে দেখা গেল রোগীর দ্বিতীয় ফুসফুসের অবস্থা খারাপ। সেখান থেকে আরও জানা গেল কভিড নিউমোনিয়া তৈরি করে দিয়েই থেমে থাকেনি। রোগী কভিডের পরে মেনিনজাইটিসেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার রিপোর্ট দেখে আমার মনে হচ্ছিল ফুসফুস ধ্বংস করাই যেন কভিডের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। এটি এখন ভাস্কুলার জটিলতা এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরিতে জটিল ভূমিকা রাখছে। সেই মহিলার বাবা-মা, স্বামী, সন্তান সবাই ছিলেন। কিন্তু এখন কেউ নেই। এরপরে তার ভাগ্যে কী ঘটেছিল আমার জানা নেই। আমার তখন দ্বিতীয় শিফটের কাজের ডাক পড়েছে। রেড জোনে যেতে হবে। ছয় ঘণ্টা ধরে একই পোশাকে আমি, একই সঙ্গে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত। যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছিলাম আর সাক্ষী হচ্ছিলাম এক ভয়াবহ সময়ের।

রেড জোনে প্রবেশ করা আর চলমান যুদ্ধের মাঝখানে হাঁটা তখন একই মনে হতো। পরিপাটি শান্ত দরজা, সংগঠিত সবকিছুর মাঝে কান ফাটানো শব্দ। আশপাশে অসুস্থ লোকেরা অক্সিজেনের অভাবে খাবি খায়। অক্সিজেন টানতে না পারলে অক্সিজেন সিলিন্ডার চেপে ধরে। তাদের পরিবারের সদস্যদের ডাকতেই থাকে। তাদের দেখা মাত্র ডাক্তার ও নার্সরা ছুটে যান তাদের দিকে। অক্সিজেন যেন ঠিকঠাকভাবে পায় সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। মাস্ক ঠিক করে দেন পরম মমতায়। রেড জোন যেন সবসময় বিপদাপন্ন থাকতে ভালোবাসে। সেখানে কোনো নীরবতা থাকে না। কেউ কাশছে, কেউ বেঁচে থাকার নির্মম প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, অক্সিজেনের হিসহিস শব্দ, সব মিলিয়ে এক বীভৎস পরিস্থিতি। ডাক্তার ও নার্সরা তাদের সুরক্ষা গিয়ারের মাধ্যমে কথা বলতে পারছেন না। নিজেদের শব্দগুলো যেন নিজের কানেই বেজে ফিরে যাচ্ছে। কোনোভাবেই সে শব্দ রেড জোনের শব্দ ছাপিয়ে আরেক ডাক্তাদের কানে গিয়ে পৌঁছাতে পারছে না।

কেউ কেউ আমাদের প্রশ্ন করেন, সাধারণ ঠান্ডার মতো কেন এক একজন রোগীকে আমরা দেখতে পারছি না? কেন এত আয়োজন করা হচ্ছে রোগী দেখতে? উত্তর দিতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে, সুরক্ষা গিয়ার ভেদ করে সে কথা পৌঁছানো কষ্টকর বলে উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না। এখানে একটুখানি শক্তি বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করতে হয়।

সেদিনটা সাধারণ সব দিনের মতো ছিল না। রেড জোনের সর্বত্র রোগীরা বসে ছিলেন, শুয়ে ছিলেন, বসে ছিলেন। তাদের ভেতরে অনেকেই প্রতীক্ষা করছিলেন সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়ার। আমি ভাবছিলাম চারপাশে এত এত রোগী নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও আমরা এত রোগীর সঠিকভাবে যত্ন নিতে সক্ষম নই। আমি ভেতরে যেতে চাইছিলাম। রেড জোনের স্লুইস গেটটি আমার পেছনে খুলে গেল। দুটো অ্যাম্বুলেন্স ভেতরে ঢুকল, তাদের কাছে পাঁচটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল। একজন বললেন, ‘হাসপাতালে অনেক অক্সিজেন আছে, সেগুলো শেষ হলে এগুলো ভালোভাবে বিতরণ করবেন।’ তারপর বোতলগুলো নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেলেন। আমি নিঃশ্বাস চেপে ভগ্নহৃদয় নিয়ে রোগীদের দিকে ফিরে তাকালাম। পাঁচ বোতল! মাত্র পাঁচ বোতল অক্সিজেন সিলিন্ডার! কম করে হলেও ষাট জন রোগীর জন্য মাত্র পাঁচ সিলিন্ডার অক্সিজেন দেওয়া হলো। কে জানে পরবর্তী চালান কখন আসবে। সম্ভবত পরের দিন সকাল হবে পরের চালান আসতে। আমি শ্বাস নিতে পারছি না! আমরা আসলে এত রোগীর যতœ করতে সক্ষম নই। তবে আমরা এখনো চেষ্টা করে যাব।’