পরিচয় করিয়ে দিতে মামুনুর রশীদ নামটিই যথেষ্ট। দর্শকমাত্রই জানেন, আধুনিক সময়ে তার মতো বলিষ্ঠ অভিনেতা, নাট্যকার ও নাট্যশিক্ষক খুব কমই আছেন এদেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। নিয়মিত বই লেখেন, কলাম লেখেন, বক্তা হিসেবে দেশে-বিদেশে আমন্ত্রিত হন। কিন্তু যে অভিনয় তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা দিয়েছে শত ব্যস্ততার মাঝেও তা ভুলে যাননি তিনি। এই বয়সে এসেও দিব্যি অভিনয় করে যাচ্ছেন। তার বয়সী আরও অনেকেই অভিনয় করছেন নিয়মিত, কিন্তু তিনি ব্যতিক্রম। কারণ গৎবাঁধা চরিত্রে তাকে খুব একটা পাওয়া যায় না। হোক সে ব্যাপ্তিতে ছোট চরিত্র, তাতে থাকতে হবে বিশেষ কিছু। তাহলেই মামুনুর রশীদকে রাজি করানো যাবে। এই ‘স্ফুলিঙ্গ’ ছবিটির কথাই ধরা যাক। সদ্য মুক্তি পাওয়া তৌকীর আহমেদের এই ছবিতে অনেক নাম করা অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকে যে যার চরিত্রে সাবলীল। কিন্তু মামুনুর রশীদ ক্ষণিকের উপস্থিতিতে যেন সবাইকে ছাপিয়ে যান। পর্দায় একই সঙ্গে একজন আদর্শ শিক্ষক এবং অসহায় পিতার চরিত্রের আকুতি দর্শককে নাড়া দেয়। অজান্তেই দর্শকের চোখে জল এনে দেয়। এটাই তো দক্ষ অভিনেতার কাজ। চরিত্রটি নিয়ে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমি যে শিক্ষকের চরিত্রটি করেছি সে মূল্যবোধ ধারণ করে জীবন যাপন করেছে আজীবন। জীবনের শেষ দিকে এসে তার ভেতর ও বাইরের ক্রাইসিস তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। এ ধরনের চরিত্র সমাজে বিদ্যমান। এ ধরনের চরিত্র আমি চোখে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতাই পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। চরিত্রের ব্যাপ্তি কী তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। এই যে সবাই আমার পারফরমেন্স পছন্দ করেছে, তাদের আবেগকে স্পর্শ করেছে এটাই তো সবচেয়ে বড় অর্জন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তৌকীর ভালো নির্মাতা। তার ছবিতে কাজের ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। অবশেষে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো। কিন্তু ছবিটি আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল। এটা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এমন সময়ে ছবিটি মুক্তি পেল যখন করোনার কারণে আমরা সবাই নাজেহাল। নয়তো ছবিটি আরও ভালো ইমপ্যাক্ট ফেলত বলে আমার বিশ্বাস।’
চলমান লকডাউনে একদমই শ্যুটিং করছেন না মামুনুর রশীদ। তবে শিল্পীকে কি শিল্পচর্চা থেকে দূরে রাখা যায়? তাইতো তিনি এই অবসরে ঘরে বসে প্রচুর বই পড়ছেন। এছাড়া বিটিভির জন্য একটি ধারাবাহিক নাটক লিখছেন। নাটক নিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকার ২০০ বছরের বর্ণাঢ্য ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে জিন্দাবাহার নামে ধারাবাহিকটি লিখছি। শ্যুটিংও এগিয়েছে অনেকখানি। রোজার মধ্যে আপাতত শ্যুটিং বন্ধ আছে। তবে ঈদের পরে আবার শুরু হবে। শুনেছি কোরবানির আগেই বিটিভিতে এটির প্রচার শুরু হবে। ফজলে আজম জুয়েল পরিচালিত এ নাটকে আজাদ আবুল কালাম, আহমেদ রুবেল, নাজনিন হাসান চুমকি, শতাব্দী ওয়াদুদ, সায়েকাসহ অনেক দক্ষ অভিনেতারা কাজ করছে।’
সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যেও অনেকে ঈদের নাটকের শ্যুটিং করছেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আসলে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো মতামত দেওয়া কঠিন। কারণ এই করোনার মধ্যে শ্যুটিং করা সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এটাও ভাবতে হবে যে, নাটক একটি ইন্ডাস্ট্রি। ঈদের সময়টি নাটকের ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমন সিজনে নাটকের সংকট দেখা দিলে সারা বছরে ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতির মধ্যে থাকবে। এছাড়া টানা শ্যুটিং বন্ধ থাকলে শিল্পী-কলাকুশলীদের জীবন ধারণ কষ্ট হয়ে যায়। তাই যারা শ্যুটিং করছে তারা সব ভেবেই করছে। আমি বলব, আপনারা কাজ করলেও অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে করবেন। এখন সচেতনতা মূল কাজ।’
লকডাউনের আগে মামুনুর রশীদ সর্বশেষ কাজ করেছেন প্রচার চলতি ধারাবাহিক নাটক ‘হাওয়ায় মিঠাই’-এর। এটি পরিচালনা করেছেন নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল। মফস্বলের প্রেক্ষাপটের এ নাটকে তার চরিত্রটি বেশ মজার। দুটি পরিণত মেয়ে থাকা সত্ত্বেও তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই নিয়ে যত বিপত্তি। তার সহশিল্পী হিসেবে আছেন রোজী সিদ্দিকী, নাদিয়া মিমসহ অনেকে। এছাড়া তিনি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রথম ওয়েব সিরিজেও কাজ করেছেন। এ কাজটি নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী।