এ মাসের মাঝামাঝিতে দেশে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার টিকা ‘কভিশিল্ড’-এর মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন এমন ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ১১২ জন এ টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাচ্ছেন না। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট বলছে, আগামী জুনের আগে সেরাম থেকে টিকা আসার সম্ভাবনাও নেই। তবে উপহার হিসেবে চীনের দেওয়া ৫ লাখ ডোজ টিকা ১০ মে’র মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে চলমান টিকাদান কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশকিছু প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে, মজুদ শেষ হওয়ার আগেই টিকা না এলে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু বর্তমান মজুদ টিকার মেয়াদ জুন পর্যন্ত রয়েছে, সে ক্ষেত্রে এ টিকা সীমিত সংখ্যায় দিয়ে জুন পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচি চালানো যাবে। এর মধ্যেও টিকা না এলে আর টিকা দিতে পারবে না অধিদপ্তর।
অন্যদিকে টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে দুই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তারা ভাবছেন, যারা কভিশিল্ড টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তারা দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে অন্য টিকা নিতে পারবেন কি না এবং নিলেও সে টিকা কভিশিল্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে করোনা প্রতিরোধে কাজ করবে কি না? পাশাপাশি আট সপ্তাহের মধ্যে টিকার দ্বিতীয় ডোজ না পেলে ইতিমধ্যেই নেওয়া টিকার প্রথম ডোজের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে কি না এবং পরে পুনরায় প্রথম ডোজ নিতে হবে কি না?
এসব ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ৮-১২ সপ্তাহের মধ্যে টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া যাবে। সে হিসাবে যে ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ১১২ জনের দ্বিতীয় ডোজের টিকার ঘাটতি রয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ হিসেবে আগামী ৮ জুলাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিতে পারবেন। এ সময়ের মধ্যে দেশে ভারতের পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও টিকা চলে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুতরাং প্রথম ডোজের কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আরও জানান, এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজের বিপরীতে দ্বিতীয় ডোজে অন্য টিকা দেওয়ার কোনো নির্দেশনা আসেনি। যারা যে টিকা নিয়েছেন, তাদের সে টিকাই দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে দেওয়া হবে।
প্রথম ডোজ নিয়ে দ্বিতীয় ডোজের জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তিরা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা না পেলে কী করবেন জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও রোগতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম গতকাল সোমবার দুপুরে ভার্চুয়াল সংবাদ বুলেটিনে বলেন, ‘এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো এখনো নির্দিষ্ট করে কোনো পরামর্শ দেয়নি। প্রথম টিকা যে কোম্পানির নেওয়া হয়েছে, দ্বিতীয় ডোজও সেই কোম্পানির নিতে হবে।’ এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমরা ১২ সপ্তাহ অপেক্ষা করব। আশা করছি আমরা ভ্যাকসিন পেয়ে যাব। তাহলে আমরা দ্বিতীয় ডোজটিও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়ে শেষ করতে পারব।’
এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সবার প্রতি আহ্বান জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘আশা করছি, এ মাসেই চীনের ভ্যাকসিন আসবে। টিকা আসতে দেরি হোক বা যাই হোক না কেন, যতক্ষণ টিকা হাতে না আসছে মাস্ক হলো সবচেয়ে বড় টিকা। এটি সহজলভ্য, আমরা সবাই নিয়ম মেনে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেটি ব্যবহার করি।’
১০ মে’র মধ্যে চীনের ৫ লাখ টিকা আসতে পারে : উপহার হিসেবে চীনের দেওয়া পাঁচ লাখ ডোজ করোনার টিকা আগামী ১০ মে’র মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘চীন আমাদের বলেছে পাঁচ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে দেবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা আনার ব্যবস্থা করছে, হয়তো ১০ মের মধ্যে বাংলাদেশে আসতে পারে।’
সরকার চীন থেকে যে টিকা কিনতে চায় সেগুলো আসতে আরও সময় লাগবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘টিকা কেনার জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। চীন তাতে সম্মত হলে আলোচনা শুরু হবে। রাশিয়ার সঙ্গেও আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারা টিকা দিতে চায়, উৎপাদনও করতে চাচ্ছে। আমরা দুটি দেশের সঙ্গেই কথা বলে রাখছি।’
সীমান্ত ও দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ থাকবে : গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সীমান্ত বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত রয়েছে তা বহাল রয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সীমান্তগুলো বন্ধ থাকবে।
কভিড-১৯ সংক্রমণ ও এতে মৃত্যুর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সিটি করপোরেশন এলাকায় হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ অঞ্চলগুলোয় ‘কঠোর নজরদারি’ থাকবে। যানবাহন চলাচল শুরু হলেও এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যানবাহন চলাচল করবে না। আন্তঃজেলা ট্রেন বন্ধ থাকবে, নৌযান চলাচল করবে তাও বন্ধ থাকবে।
জুনের আগে সেরামের টিকা নয় : ভারতে করোনা পরিস্থিতির প্রতিদিনই অবনতি হচ্ছে। আগামী জুনের আগে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমনকি ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সময় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারতে বর্তমানে প্রতিদিন তিন লাখের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। অক্সিজেন সংকট রয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা নাজুক। এমন পরিস্থিতিতে সেরাম ইনস্টিটিউট প্রতি মাসে ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডোজ টিকা উৎপাদন করছে এবং ভারত বায়োটেক করছে ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন। এর বিপরীতে প্রতিদিন টিকা নিচ্ছে প্রায় তিন মিলিয়ন। এতদিন ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে যারা শুধু তারাই টিকা নিতে পেরেছে। গত ১ মে থেকে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাইকে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে সর্বশেষ গতকাল সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদর সি পুনাওয়ালা এক বিবৃতিতে বলেন, বিশেষ পদ্ধতিতে টিকা উৎপাদন করতে হয়। চাইলেই রাতদিন টিকা উৎপাদন সম্ভব নয়। আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে, ভারতের লোকসংখ্যা অনেক এবং এখানকার পূর্ণবয়স্ক সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়।
বিবৃতিতে এ কর্মকর্তা আরও বলেন, গত বছর এপ্রিল থেকে আমরা ভারত সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। সরকার আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা ভারত সরকারের থেকে ২৬ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার অর্ডার পেয়েছি। এর মধ্যে ১৫ কোটি টিকা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পরবর্তী ১১ কোটি টিকার জন্য শতভাগ অর্থ পেয়েছি। আগামী কয়েক মাসে সেগুলো সরবরাহ করা হবে।
বিবৃতিতে বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোতে কবে নাগাদ সেরাম টিকা সরবরাহ করবে সে ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। তবে সবাইকে টিকা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটি চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ মাসের মাঝামাঝিতে শেষ হচ্ছে মজুদ টিকা : চুক্তি অনুযায়ী সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে টিকা পাঠানোর কথা। দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস সে টিকা সরকারের কাছে পৌঁছে দেবে। কিন্তু গত জানুয়ারি মাসে প্রথম চালানের ৫০ লাখ টিকা ঠিকমতো এলেও এরপর থেকেই টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। বিপুল চাহিদা আর বিশ্বজুড়ে টিকার সরবরাহ সংকটের মধ্যে ফেব্রুয়ারির চালানে মাত্র ২০ লাখ টিকা এসেছে। এর পরের চালানে আগের ৩০ লাখসহ মোট ৮০ লাখ টিকা গত ২৬ মার্চ বা তার পর আসতে পারে বলে এর আগে জানিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই টিকা এখনো দেশে এসে পৌঁছেনি। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত দেশে টিকা এসেছে ১ কোটি ২ লাখ। এর মধ্যে দুই দফায় ভারত সরকারের দেওয়া উপহারের ৩২ লাখ টিকা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকার হিসাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর গতকাল পর্যন্ত প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৭১৯ ও দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৩০ লাখ ২৩ হাজার ১৬৯ জন। টিকা নিতে নিবন্ধন করেছেন গতকাল পর্যন্ত ৭২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৮ জন। অর্থাৎ এ পর্যন্ত মোট দেওয়া হয়েছে ৮৮ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ ডোজ টিকা। সে হিসাবে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন এমন ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ১১২ জন মানুষের দ্বিতীয় ডোজের টিকাও এখন সরকারের মজুদে নেই।
এমন পরিস্থিতিতে সময়মতো টিকা না এলে টিকাদান কর্মসূচির অবস্থা কী হবে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন দ্বিতীয় ডোজ দিচ্ছি। প্রথম ডোজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে টিকা আছে এ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। তবে এটা কমবেশি হতে পারে। তবে আগামী মাসের আগেই আমাদের টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হতে পারে। সেজন্যই আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা পেতে চেষ্টা করছি। আশা করছি ভারতের কাছে থেকে টিকা কিনেছি, সেটা নিশ্চয়ই আমরা পাব। একসঙ্গে না পেলেও আমাদের টিকা কার্যক্রম যাতে নষ্ট না হয়, সে পরিমাণ টিকা আমরা পাব।’
সরকারের করোনা টিকা ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক বলেন, ‘বর্তমানে যে টিকা আছে, সেটা মে পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যেই টিকা সংগ্রহ করতে হবে। তবে একটা সুবিধা আছে, এই টিকার দ্বিতীয় ডোজ আমাদের ৮-১২ সপ্তাহের মধ্যে নিতে হবে। সুতরাং আমাদের যদি টিকা না থাকে বা এক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে টিকা চলে আসে, তাহলে আমরা টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে পারব। বর্তমানে যে টিকা আছে সেটার মেয়াদ জুন পর্যন্ত।’