হেফাজতের তাণ্ডবের মামলায় হয়রানির অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিহ্নিতরা অধরা না.গঞ্জে ঘরছাড়া বিএনপি-জাপা!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে হেফাজতে ইসলাম নেতাকর্মীদের তাণ্ডবের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের করা মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের না ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের করা মামলায় চিহ্নিত হেফাজত নেতা ও কওমি ছাত্র পরিষদের নেতারা এজহারভুক্ত আসামি না হলেও স্থানীয় এক জাসদ নেতাকে তার জামাইসহ আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া তাণ্ডবের এক মাস পেরিয়ে গেলেও এর মূল হোতা, উসকানিদাতা ও নেতৃত্বদানকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সব রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের হরতালে সহিংসতা এবং সংগঠনটির নেতা মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ডের ঘটনায় হওয়া মামলায় বিএনপি ও জাপা নেতাদের আসামি করায় তাদের অনেকেই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপি-জাপা নেতাদের।

গত ২৮ মার্চ হেফাজতের ডাকা হরতাল চলাকালে বেলা ১১টার পর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা এলাকার থানা ব্রিজ, সড়ক ও থানা গেইটে হামলা চালায় হেফাজত কর্মী-সমর্থকরা। এ সময় ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে হামলাকারীরা। প্রাণ বাঁচাতে পুলিশও ব্যাপকসংখ্যক সিসা ও রাবার বুলেট এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। শত শত লোকের হামলায় সেদিন দিশেহারা হয়ে পড়ে পুলিশ। একপর্যায়ে তারা থানার ভেতরে ঢুকে আত্মরক্ষা করে। এ সময় পুলিশ থানা মসজিদের মাইক থেকে বারবার হেফাজত সমর্থকদের থানায় হামলা না করে তাদের অন্যান্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে বলে অভিযোগ ওঠে। মাইকে বলা হয়, পুলিশ তাদের পাশে আছে। এ ঘটনার ১৬ দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় হামলা-ভাঙচুর-তাণ্ডবের ঘটনায় মামলা করে পুলিশ। সদর থানার এসআই আবদুস সামাদ বাদী হয়ে করা এ মামলায় ৪৮ জনকে এজহারনামীয় এবং ৪০০-৫০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়। এ মামলায় ৩২ নম্বর আসামি করা হয়েছে শহরের কান্দিপাড়া এলাকার সানু মৃধার ছেলে আঙ্গুর মৃধাকে। যার পুরো নাম মিজানুর রহমান আঙ্গুর ওরফে আঙ্গুর মৃধা। বয়স ৬০ বছর। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাসদের (ইনু) কার্যকরী সদস্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর জাসদের সভাপতি।

মামলার আসামি হয়ে হতবাক আঙ্গুর মৃধা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা জীবন মোল্লাতন্ত্র আর মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আর এখন বৃদ্ধ বয়সে এসে আসামি হলাম সন্ত্রাসী-মৌলবাদী হিসেবে। আমার জন্য এটি বড় বেদনার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে দীর্ঘকাল থেকে এলাকার প্রভাবশালী একটি চক্রের মূল্যবান জমি-জায়গা নিয়ে বিরোধ আছে। ধারণা করছি এ বিরোধের প্রতিশোধ নিতেই আমাকে ও আমার মেয়ের জামাইকে পুলিশের মামলায় আসামি করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে রাত কাটাই।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আখতার হোসেন সাঈদ বলেন, ‘যে জাসদ মৌলবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার সেই জাসদের নেতাকে হেফাজতের তা-বের ঘটনায় আসামি করে পুলিশ চরম নিন্দনীয় কাজটিই করেছে। আমরা দ্রুত জাসদ নেতা আঙ্গুরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি করছি।’

আঙ্গুর মৃধাকে আসামি করায় জেলা ১৪ দলের সভায়ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এ সভা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকার ১৪ দলের ক্ষোভের বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা মনে করি প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে তান্ডবের ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যেই জাসদ নেতা আঙ্গুরকে আসামি করা হয়েছে। আমরা ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামি করা ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছি শুরু থেকেই।’

আঙ্গুর মৃধার সঙ্গে একই মামলায় ১৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে তার মেয়ের জামাই জসীম উদ্দিন বাচ্চুকে। তিনি শহরের কান্দিপাড়া এলাকার প্রয়াত জহুর আহমেদের ছেলে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়নের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। মামলায় আসামি করার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাখাওয়াত হোসেন একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। যেখানে উল্লেখ করেছেন যে জসীম উদ্দিন গত ২৮ মার্চ নিজ কর্মস্থল বুধলে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া প্রতিদিনকার অফিশিয়াল প্রতিবেদন ফরম ‘দৈনিক টিকা ও অন্যান্য সেবা রিপোর্ট’-এ দেখা গেছে তিনি মামলায় উল্লিখিত তারিখের দিন নিজ কর্মস্থল বুধল এলাকায় কর্মকান্ড পরিচালনা করেছেন। তার কর্মস্থল মামলায় উল্লিখিত ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জসীম উদ্দিন আমাদের বুধল এলাকার সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক। গত ২৮ মার্চ জসীম উদ্দিন বুধলে সাপ্তাহিক টিকা কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাকে মামলার আসামি করা হয়েছে শুনে কষ্ট পেয়েছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার বাদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার এসআই আবদুস সামাদ বলেন, ‘নানা কারণে মামলায় আসামি হয়ে যায়। আমরা তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব। আমরা কোনোভাবেই নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করব না।’

আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসির দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘স্থানীয় তদন্তে ও ভিডিও ফুটেজ দেখেই মামলায় আসামি করা হয়েছে। পরবর্তীতে আরও তদন্ত করে দেখা হবে কে দোষী আর কে নির্দোষী।’

নারায়ণগঞ্জে ঘরছাড়া বিএনপি-জাপা : গত ২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ও সাইনবোর্ড এলাকায় ব্যাপক নাশকতা করে হেফাজতকর্মীরা। এ ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা হয় একাধিক। একটি মামলায় বিএনপির এক মৃত নেতাকেও করা হয় আসামি। যিনি কারা অভ্যন্তরেই মারা গিয়েছিলেন। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে পরে অবশ্য তা সংশোধন করে পুলিশ। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির দাবি, তাদের কোনো নেতাকর্মী হেফাজতের হরতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ভৌতিক মামলা করে। সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা নীরবে নিভৃতে কলেজে অধ্যাপনা করে সময় কাটালেও তাকে করা হয় আসামি। এ ছাড়া মামুন মাহমুদ, মনিরুল ইসলাম রবি, জুয়েল রানা ও জুয়েল প্রধানসহ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হয় মামলা। জ্বালাও-পোড়াওয়ের অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। শুরু হয় ধরপাকড়। গ্রেপ্তার হন বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। ফলে নিজ ঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বিএনপি নেতাকর্মী। তারা বর্তমানে এলাকা ছেড়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন।

গত ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ে রয়েল রিসোর্টকা-ের দিন হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে নারীসহ আটকের জের ধরে তা-বের ঘটনায় একাধিক মামলা হয়। ওইসব মামলায়ও হেফাজত নেতাদের পাশাপাশি আসামি করা হয় স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের। মামলায় নাম না থাকার পরও গ্রেপ্তার করা হয় সোনারগাঁ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও শম্ভুপূরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রবকে। এ ঘটনায় জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সোনারগাঁয়ের এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের একপক্ষের সঙ্গে টানপড়েন চলছে জাপার।

বিএনপির মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, এই মুহূর্তে গ্রেপ্তার হলে আইনি লড়াই করার মতো তাদের আর্থিক সংগতি নেই। দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্বের কারণে পারিবারিকভাবে তারা রয়েছেন অর্থ সংকটে। এর ওপরে ‘বিনা কারণে’ ‘বিনা দোষে’ মামলায় আসামি করায় তারা এখন পড়ে গেছেন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে। দলের পদধারী নেতারা অজ্ঞাত কারণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির নেতৃত্ব দুর্বলতা অনেক দিনের। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে এর উপযুক্ত সমাধান না দেওয়ায় ফের বিপদগ্রস্ত নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতাকর্মীরা।

অভিযোগ উঠেছে, আহ্বায়ক কমিটির মূল নেতারাই এখন চলেন সরকারি দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে। তারা এখন নিজেদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত। ফলে আশ্রয় দেওয়ার মতো এখন আর নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে কোনো নেতা নেই। যার ফলে অসহায় হয়ে পড়েছেন তৃণমূলের বিএনপির নেতাকর্মীরা।