তৃতীয়বারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ‘সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতির’ বিরুদ্ধে জেতা মমতা আজ এমন পরিস্থিতিতে শপথ নিতে যাচ্ছেন যেখানে জয়ের পরে নানা সহিংসতায় অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে তৃণমূল-বিজেপি দুই দলের নেতাকর্মী-সমর্থক আছেন। কোথাও কোথাও রাজনীতির এই সংঘাতে দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক রং। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ জন্য দোষ চাপিয়েছেন বিজেপির ওপর। রাজ্যজুড়ে ভোটপরবর্তী রাজনৈতিক সংঘর্ষের দায়ও বিজেপির ওপর চাপিয়েছেন। বলেছেন, ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা আগে থেকে করে আসছে বিজেপি। এর দায় মোদি-অমিত শাহর।
পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজার জানায়, গতকাল মমতা একটি সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে তিনি বলেছেন, ‘সিবিআই, ইডির মতো সরকারি সংস্থাকে ব্যবহার করে যে রাজনীতি মোদি-অমিত শাহরা করছেন, তার অবসান হওয়া উচিত। বিজেপির পুরনো নেতারাও মোদি-অমিত শাহর রাজনীতির ধরনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেশকে আর এমন রাজনীতির মুখোমুখি হতে দেওয়া যায় না। মোদি-অমিতের থেকেও অনেক যোগ্যরা রয়েছেন।’
মমতা বলেন, ‘শুধু কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা নয়, রাজ্যে বিধানসভা ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।’ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও ফের ‘পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের’ অভিযোগ তুলেছেন মমতা।
ভোটের প্রচারে বিজেপির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভুয়া’ ছবি, অডিও এবং ভিডিও প্রচারের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, এমন হিংসার রাজনীতি বিজেপিই করে। কভিড পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং টিকাকরণ নিয়ে মোদি সরকারের ভূমিকা এবং টিকার দামে বৈষম্যের প্রসঙ্গও এসেছে ওই সাক্ষাৎকারে।
ওদিকে রাজ্যের সহিংস পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়কে ফোন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনেকেই। এর মধ্যে আছেন বিজেপির অনেক চিহ্নিত নেতাকর্মী ও সমর্থক। উসকানির অভিযোগে গতকাল ভারতীয় অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউতের টুইটার অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বরাবরই বিজেপির ‘উগ্র সমর্থক’।
তবে ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য মূল ঘটনা যেটা ঘটছে, এই ইস্যুকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন বিজেপির চিহ্নিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অনেকে। পুরনো অনেকে ছবি ও ভিডিও ফেইসবুক-টুইটারে ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিজেপির সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। অনেকে আবার মোদি-অমিত শাহকে বাংলায়ও গুজরাটের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হওয়ার পরেই একের পর এক বিরূপ টুইট করতে থাকেন তিনি। তৃণমূলের এই বিজয়ের পেছনে কঙ্গনা রানাউত সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দায়ী করেছেন বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গাদের। কঙ্গনা টুইটারের একটি পোস্টে লেখেন, ‘বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গারা মমতার সবচেয়ে বড় শক্তি। যা চলছে, তাতে হিন্দুরা আর সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বাঙালি মুসলিমরা বেশি দরিদ্র্য আর সবচেয়ে দুরবস্থায় জীবনযাপন করে। ভালো, আরেকটি কাশ্মীর তৈরি হচ্ছে।’
এখানেই থামেননি কঙ্গনা। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাবনের সঙ্গেও তুলনা করেন তিনি। তিনি প্রতিহিংসামূলক টুইট করে লিখেছেন, ‘এটা ভয়ংকর...গুন্ডা কে মেরে ফেলার জন্য আমাদের সুপার গু-ার প্রয়োজন...। তিনি অব্যক্ত দানবের মতো, তাকে দমন করার জন্য দয়া করে ২০০০ সালের প্রথম দিকের বিরাট রূপটা দেখান মোদিজি।’
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বিজেপিকে সমর্থন করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছেন এই বলিউড অভিনেত্রী। এই অভিযোগ তুলে কলকাতা পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কঙ্গনা রানাউতের বিরুদ্ধে। হাইকোর্টের আইনজীবী সুমিত চৌধুরী ই-মেইল মারফত কঙ্গনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন গত সোমবার।
বিজিপিও ভোটের আগে থেকেই দাবি করে আসছে, মমতার দল হিন্দুদের হয়রানি করছে। খোদ মোদি ও অমিত শাহ দেন সেই উসকানি। তখন কমিশনেও অভিযোগ করা হয় বিষয়টি নিয়ে।
গতকাল বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ কলকাতার দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনপরবর্তী রাজনৈতিক সংঘর্ষে তাদের দলেরই আটজন মারা গেছেন। তাদের বহু সমর্থকের বাড়িঘর, দলীয় অফিস ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। বহু বিজেপি কর্মী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ এবং প্রাণহানি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে।
এদিকে বিজেপির হতাহত সমর্থকদের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে দুদিনের সফরে কলকাতায় অবস্থান করছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। তিনি গতকাল প্রথম দিনে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সোনারপুরে গিয়ে আহত ও নিহত সদস্যদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।
নাড্ডা বলেন, ‘দেশ বিভাগের সময় এ ধরনের সংঘর্ষ এবং সহিংসতার খবর শুনেছি। এবার তৃণমূল সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি করেছে। আমরা ন্যায়ের সঙ্গে আছি। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই না। আমরা এই নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাসের গণতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা করব।’
বিজেপির ধর্ম নিয়ে রাজনীতির ‘স্বভাবের’ বিষয়ে অ্যাক্টিভিস্ট ও ফিল্মমেকার কস্তুরী বসু বিবিসি বাংলা অনলাইনকে বলেন, ‘বিজেপি তাদের রাজনৈতিক ল্যাবরেটরির সবচেয়ে সফল পরীক্ষাটা কিন্তু সমাজের বুকেই চালাতে অভ্যস্ত। যে জিনিসটা বিজেপি এ রাজ্যে সবচেয়ে বেশি আর একটানা করে গেছে, তা হলো সব জিনিসকে কমিউনালাইজ করা বা সাম্প্রদায়িক রং দেওয়া। এখন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে এই জিনিসটাই তারা এখন দশ-বারো গুণ বেশি করবে।’
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে চলমান সহিংসতার ঘটনা কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে খতিয়ে দেখার আদেশ দিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলার আবেদন করেছেন বিজেপির সমর্থক গৌরব ভাটিয়া। তিনি তার আবেদনে অবিলম্বে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও বাড়িঘর ভাঙচুর বন্ধের পাশাপাশি এসব ঘটনায় সিবিআই দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
শপথ আজ : আজ স্থানীয় সময় বেলা পৌনে ১১টায় রাজ্যপালের দপ্তর রাজভবনে মুখ্যমন্ত্রীর পদে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে শপথ নেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, বিদায়ী স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদায়ী বিরোধীদলীয় নেতা কংগ্রেস বিধায়ক আবদুল মান্নান, বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু, কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরী, কংগ্রেস সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য, ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলী, তৃণমূলের ভোট-কুশলী প্রশান্ত কিশোর প্রমুখকে।