শপথ নিয়েই করোনা নিয়ন্ত্রণে কড়া নির্দেশনা মমতার

টানা তৃতীয়বারের মতো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টার দিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের দাপ্তরিক ভবন রাজভবনের ‘ঐতিহাসিক থ্রোন’ কক্ষে রাজ্যশাসনের দায়িত্বভার তুলে নেন মমতা। ভয়ংকর হয়ে ওঠা করোনা মহামারীর মধ্যেই অনুষ্ঠিত ভোটে বিপুল জনরায় পাওয়া মমতা তাই দায়িত্ব নিয়ে জানালেন, তার প্রথম কাজই হবে রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সাম্প্রদায়িক উসকানির বিষয়েও হুঁশিয়ার করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

গতকাল মমতাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়। স্বল্প পরিসরে আয়োজিত এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন তৃণমূলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ছাড়াও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, বিদায়ী স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা মনোজ টি¹া, বিদায়ী বিরোধীদলীয় নেতা কংগ্রেস বিধায়ক আবদুল মান্নান, বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু, কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরী, কংগ্রেস সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য, প্রখ্যাত ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি ও তৃণমূলের ভোট-কুশলী প্রশান্ত কিশোর।

পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরÑ শপথ নেওয়ার দিনই মমতাকে হিংসা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হতে আর্জি জানালেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়।

মমতাকে ‘ছোট বোন’ হিসেবে সম্বোধন করে ধনখড় বলেন, ‘পর পর তিন বার ক্ষমতায় আসার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। শুভেচ্ছা জানাই। তবে এই মুহূর্তে রাজ্যে অহেতুক হিংসা বন্ধ করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ এর ফলে সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আশা করি, রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে শিগগিরই ব্যবস্থা নেবেন তিনি।’

জবাবে মমতা বলেন, ‘বাংলা অশান্তি পছন্দ করে না। আমি নিজেও করি না। রাজ্যে ভোট চলায় ৩ মাস আমার হাতে ক্ষমতা ছিল না। সবাইকে বলব, শান্তি, শৃঙ্খলা এবং সংহতি বজায় রাখুন। ভোটের পর কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে। আজ থেকে আইনশৃঙ্খলা আমার হাতে। কঠোর হাতে এই অশান্তির মোকাবিলা করব। ফিরে গিয়ে যেখানে যেখানে যাদের পোস্টিং করার করব। অশান্তি করলে আমি কিন্তু কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পিছপা হব না। সবাইকে বলব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ করবেন না।’

আর শপথ নেওয়ার কিছু সময় পরেই নিজ দপ্তর নবান্নে গিয়েই করোনা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য জুড়ে কিছু বিধিনিষেধ ও পরিকল্পনার ঘোষণা দেন তৃতীয়বারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। বুধবার নবান্নে দলীর নেতাকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষ করে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মমতা। তখনই তিনি নতুন নির্দেশিকা ঘোষণা করেন। মমতা বলেন, ‘প্রথম কাজ হবে রাজ্যের কভিড পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।’

নতুন নির্দেশনা অনুসারে আজ বৃহস্পতিবার থেকে সমস্ত লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকবে। মেট্রো ও বাসের সংখ্যাও কমিয়ে অর্ধেক হয়েছে। বিমানযাত্রার ক্ষেত্রে কভিড রিপোর্ট নেগেটিভ হওয়া বাধ্যতামূলক হয়েছে।

এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই মাস্ক এবং স্যানিটাইজার ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়ে আসছে সরকার। বুধবার মমতা বলেন, ‘সবাইকে আবশ্যিকভাবে মাস্ক পরতেই হবে। ব্যবহার করতে হবে স্যানিটাইজার।’

আনন্দবাজার জানাচ্ছে, রাজ্যের সরকারি এবং বেসরকারি দপ্তরগুলোকে ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাড়ি রেখে কাজ করার নির্দেশনাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এর আগে নির্দেশিকা জারি করে শপিংমল এবং কমপ্লেক্সগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আপাতত তা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন মমতা। শপিংমল, রেস্তোরাঁ, পানশালা সব বন্ধ থাকবে। তবে এখনই লকডাউনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

আগামীকাল বৃহস্পতি ও পরশু শুক্রবার চার দফায় নবনির্বাচিত বিধায়কদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন নবনিযুক্ত প্রোটেম স্পিকার সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ৯ মে রাজ্যের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে রাজভবনেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজয় লাভ করায় তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আবদুল মোমেন। গতকাল বুধবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা এক পত্রে ড. মোমেন এ অভিনন্দন জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনে জনগণের সমর্থন (সধহফধঃব) লাভ করেছে, যা আপনার নেতৃত্বের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের জনগণের অব্যাহত আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ আপনি বাঙালির দীর্ঘ লালিত মূল্যবোধ ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ’ ধারণ করেছেন এবং এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সারাজীবন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।’

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ড. মোমেন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান এবং সাম্প্রতিক বছরে দু’দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো আরও প্রসারিত হয়েছে। অবিভক্ত ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, মূল্যবোধ এবং বংশানুক্রমিক সংযোগ দু’দেশের জনগণের সম্পর্ককে অনন্য ও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ বাংলাদেশিদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিববর্ষ এবং বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপনের এ বিশেষ বছরে আমি পশ্চিমবঙ্গের জনগণসহ ভারতের জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন ও আত্মত্যাগকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার অঙ্গীকার ও সহযোগিতার মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর সমাধান হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

ড. মোমেন চিঠিতে আরও বলেন, ‘অজানা শত্রু করোনাভাইরাসের কারণে সারাবিশ্ব নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের সস্মুখীন হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ দু’দেশের পারস্পরিক সম্পদ ও অভিজ্ঞতা  বিনিময় এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সকলে সম্মিলিতভাবে এ মহাবিপদ থেকে মুক্ত হয়ে শীঘ্রই স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকায় ফিরতে পারব।’