যাত্রীবেশে অটোরিকশা চুরি বাধা দিলেই চালককে হত্যা

কখনো চালের বস্তা, কখনোবা কাঁচাবাজার কিংবা ভারী কোনো মালামাল নিয়ে অটোরিকশা ভাড়া করেন একজন বয়স্ক ব্যক্তি। এরপর পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক নিরিবিলি কোনো স্থান দেখে ‘অসহায়ত্বের’ অজুহাতে সেই ভারী মালামাল নিজ বাসা কিংবা গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ওই রিকশাচালককে অনুরোধ করেন ওই ব্যক্তি। এরপর সরল বিশ^াসে যাত্রীর দেখানো স্থানে মালামাল নিয়ে যাওয়ামাত্রই রিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায় ঘটনাস্থলে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা চক্রটির অন্য সদস্যরা। তারপর চুরি করা সেসব অটোরিকশার রং পরিবর্তন করে বিক্রি করে দেয় চক্রটি। অনেক সময় আবার যন্ত্রপাতি খুলেও বিক্রি করে তারা। কোনো সময় চুরির বিষয়টি চালক বুঝে গেলে কিংবা বাধা দিলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলে চক্রটির সদস্যরা। সম্প্রতি বেশ কিছুদিন ধরে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র যাত্রীর ছদ্মবেশে এভাবেই অটোরিকশা চুরি করে আসছে বলে জানায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিদিন সকালে দল বেঁধে এভাবেই চুরি করতে বের হয় চক্রটির সদস্যরা। চলতি রমজান মাসে ১৭টির বেশি অটোরিকশা চুরি করার কথা জানায় তারা। কয়েকটি ধাপে এই চুরি করে থাকে অভিযুক্তরা। এ কাজের জন্য তাদের নিজস্ব একটি গ্যারেজ রয়েছে। চুরি করা সেসব অটোরিকশা সেই গ্যারেজে নিয়ে রং বদল করে বিক্রি করে থাকে তারা।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বুধবার ডিএমপির দক্ষিণখান থানা ও ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির হোতাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি অটোরিকশা ও ১৫টি ব্যাটারি জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলো মো. বাবুল মিয়া (৫০), জাহিদুল হাসান শিশির (৩২), শেখ সোহাগ হোসেন মিন্টু (৩১), তৈয়বুর রহমান আকন্দ (৬০), মো. অনিক (২৭), মো. জামাল হোসেন (৩৬), মো. জসিম খান ওরফে টোকাই জসিম (৩০), শেখ মিলন (৪০) ও জাহাঙ্গীর আলম (৩১)।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, এই চোর চক্রের হোতা মো. বাবুল মিয়া। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, চুরির সময় অসুস্থ কিংবা বৃদ্ধের অভিনয় করত বাবুল। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অটোরিকশা চুরি করে আসছে সে। তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে ৮টি চুরির মামলা রয়েছে। চুরি করে সে অনেক সম্পদের মালিকও হয়েছে। ইতিমধ্যে গাজীপুরে সাত কাঠা জমি কিনেছে বাবুল। ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিকসের দোকান রয়েছে তার। তবুও এই চুরি ছাড়তে পারেনি সে। বাবুল তার সহযোগীদের নিয়ে চলতি রমজান মাসেই ১৭টি অটোরিকশা চুরি করেছে। এখন পর্যন্ত কয়েক শ অটোরিকশা তারা চুরি করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা জানায়, কিছুদিন আগে নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় একটি অটোরিকশা চুরি করতে গিয়ে বাধা পেয়ে চালককে হত্যার পর ব্রিজ থেকে ফেলে দেয় চক্রের সদস্যরা। ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা খবর নেওয়া হচ্ছে। এই চক্রে অন্তত ১৫ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

অভিযুক্ত বাবুল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘আমি প্রথমে কাঁচাবাজর থেকে দুই থেকে তিন হাজার টাকার আলু ও সবজি কিনি। এগুলো বস্তায় ভরে বাজার থেকেই অটো ভাড়া করি। এরপর একটু নির্জন স্থানে গিয়ে একটি বাড়ি দেখিয়ে বলি আমার বাসা তিনতলায়, আমি অসুস্থ মানুষ, একটু বস্তাটা তুলে দাও, আমি তোমার গাড়ির কাছে আছি। এতে সে রাজি না হলে বাসার সামনে সিঁড়ির কাছে দিয়ে আসতে বলি। এভাবে পীড়াপীড়ির একপর্যায়ে বস্তা নিতে রাজি হয় সে। বস্তা নিয়ে আমার দেখানো মতো জায়গায় যাওয়ামাত্রই ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে অটোরিকশাটি চালুর পর সেটি নিয়ে পালিয়ে যায় আমার দলের অন্য সদস্যরা। তাদের সঙ্গে আমিও পালিয়ে যাই।’

ডিবির ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম লিডার অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) আশরাফউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দক্ষিণখান থানাধীন আজমপুরা কাঁচাবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে অটোরিকশা চোর চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করি। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি চোরাই অটোরিকশাও জব্দ করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার নবাবগঞ্জ থানাধীন দিঘিরপাড় এলাকা থেকে দুটি চোরাই অটোরিকশাসহ আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অটোরিকশা চুরিতে এর চালক বাধা দিলে তাকে হত্যার কথাও স্বীকার করেছে গ্রেপ্তাররা। আমরা সব বিষয় নিয়ে তদন্ত করছি। তাদের রিমান্ডে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, চক্রটির সদস্যরা দূরে কোথাও যাওয়ার কথা বলে চালকের সঙ্গে ভাব জমাত। একপর্যায়ে খাবারের সঙ্গে নকটিন জাতীয় ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে চালকদের অচেতন করে রিকশা নিয়ে পালাত তারা। আমরা ধারণা করছি, চক্রটি একই কায়দায় প্রাইভেট কারও চুরি করছে। এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত আছে।