মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে বাংলাদেশে ৪৪ শতাংশ কর প্রদান করতে হয়, যা বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করা এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে আনতে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে কর হ্রাসের মাধ্যমে করনীতির সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করছে মোবাইল ফোন অপারেটররা। এজন্য টেলিকম খাতে বর্তমানের ন্যূনতম টার্নওভার ও করপোরেট কর কমানোর দাবি জানিয়েছে তারা।
গতকাল ‘অ্যাক্সিলারেটিং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ইন বাংলাদেশ : রিকমেন্ডেশনস ফর মোবাইল-সেক্টর ট্যাক্সেসন রিফর্ম’ শীর্ষক ভার্চুয়াল রাউন্ড টেবিল বৈঠকে এমন দাবি জানিয়েছে অপারেটররা।
বৈঠকে অংশ নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেলিকম অপারেটরদের ওপর আরোপিত করপোরেট ট্যাক্সের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য টেলকো অপারেটরদের প্রতি আহ্বান জানান।
গতকালের এ অনুষ্ঠানে জিএসএমএ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে ৪৪ শতাংশ কর প্রদান করতে হয়, যা বিশে^র তৃতীয় সর্বোচ্চ। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী আইসিটি খাতের কর স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার সীমিতকরণ, সেবার মান উন্নয়নে বাধা এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। এতে বলা হয়েছে, ‘আইসিটি খাতে করের সংস্কার হলো একটি অত্যাবশ্যকীয় নীতিগত সংস্কার যা বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের আওতা বৃদ্ধি করবে।’
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে মোবাইল সেবাদাতাদের প্রতি ১০০ টাকা রাজস্বের প্রায় অর্ধেকই কর এবং নানা ধরনের রেগুলেটরি ফি হিসেবে প্রদান করতে হয়, যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর এ ধরনের গড় ফির প্রায় দ্বিগুণ। এই অর্থ দেশের জনগণকেই পরিশোধ করতে হয় যার প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে।
বাংলাদেশের অনেক নাগরিকের জন্য ২০০ টাকা সিম ট্যাক্স বোঝা হয়ে দাঁড়ায় বলেও গবেষণায় বলা হয়েছে। এছাড়াও মোবাইল সেবার ওপর মোট ৩৫ শতাংশ কনজিউমার ট্যাক্স বা ভোক্তাপর্যায়ে কর আরোপিত আছে যা সরকারের কোযাগারে যুক্ত হয়; এর ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১ শতাংশ সারচার্জ।
গতকালের অনুষ্ঠানে সিমের ওপর আরোপিত ট্যাক্স বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) মনে করে যে এশিয়ার দেশগুলোতে ১০ শতাংশ মোবাইল ব্রডব্যান্ড অন্তর্ভুক্তির কারণে জিডিপিতে জনপ্রতি অবদান দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরগুলো এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ফলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশে সর্বাধিক ৯৫ শতাংশ ফোরজি নেটওয়ার্ক কভারেজ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল থেকে বঞ্চিত। ডিজিটাল অর্থনীতিতে এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ করতে না পারা ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক হতে পারে।
জিএসএমএ-এর এশিয়া প্যাসিফিকের প্রধান জুলিয়ান গরম্যান বলেন, ‘মোবাইল অপারেটররা কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে নিজেরাই কঠিন সময় অতিবাহিত করেছে। তারপরও তারা গ্রাহকদের সংযুক্ত রেখে তাদের ব্যবসা, শিক্ষা এবং সমাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। বিশ্বজুড়ে এ মহামারী জানান দিয়েছে যে, একটি সংযুক্ত জনগোষ্ঠীই পারে অর্থনীতিকে সুসংহত রাখতে, যা ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একটি পরিকাঠামো (প্ল্যাটফর্ম) প্রস্তুত করে। একে আমাদের ত্বরান্বিত করতে হবে। এ খাতের শিল্প কর সংস্কার করা হলে বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ আরও প্রসারিত হবে, যা বাংলাদেশকে অভাবনীয় অর্থনৈতিক সুবিধা দেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প কর নীতির অনুপস্থিতি বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপকল্পকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।’
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জিএসএমএ অর্থনীতির অন্যান্য স্তরের সঙ্গে মিল রেখে মোবাইল খাতের করনীতি সংস্কারের সুপারিশ করেছে। জিএসএমএ মনে করে, এ খাতের বর্তমান ন্যূনতম টার্নওভার কর ২ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে জিডিপিতে বছরে ৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে বৃদ্ধি করবে এবং পাঁচ বছর পরে এই অবদান ৪৭৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে।
এছাড়া মোবাইল খাতে করপোরেট করের হারকে বর্তমানের ৪৪ শতাংশ থেকে নামিয়ে ৪০ শতাংশ করা এবং একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত মোবাইল অপারেটরগুলোর ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
এমটব প্রেসিডেন্ট মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, টেলিকম খাত বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি। তবে দুর্ভাগ্যজনক যে, কর ব্যবস্থা অর্থনীতিতে এই খাতের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে না। টেলিকম খাত যেমন তামাকসহ অন্যান্য শিল্পের তুলনায় যতটা ন্যায্য তার চেয়ে বেশি কর প্রদান করে। এটা ডিজিটাল অবকাঠামো সৃষ্টিতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। মোবাইল খাতের আর্থ-সামাজিক অবদান বিবেচনা করে এবং ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রা ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব কর ব্যবস্থার প্রবর্তনের অনুরোধ জানাই।