নির্দেশনা অমান্য করে মার্কেট খোলা থাকছে রাত ১২টা পর্যন্ত

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সারা দেশে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ কিংবা ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ মধ্যেই জীবন-জীবিকা বিবেচনায় এনে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করে দোকান-শপিং মল-বিপণিবিতান খুলে দিয়েছে সরকার। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দোকান খোলা রাখা যাবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। তবে সেই নিষেধাজ্ঞাকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা শপিং মল খোলা রাখছেন রাত ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত। ঈদের আর কয়েক দিন বাকি এই অজুহাতে ব্যবসায়ীরা মানছেন না সরকারি সিদ্ধান্ত। দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করলেও এখনো সেই আবেদনে সাড়া মেলেনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিলাম। কোনো লাভ হয় নাই।’ প্রজ্ঞাপন অমান্য করে দোকান খোলা রাখা হচ্ছে বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম; তিনি আমাদের সঙ্গে এগ্রি করলেও পরে কোনো সিদ্ধান্ত দেন নাই। আমরা আবার তার সঙ্গে কথা বলব সময় বাড়ানোর ব্যাপারে।’

এদিকে সামাজিক দূরত্ব প্রসঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই বলেছেন, এটা একটা ‘অলিক’ বিষয়। মার্কেটে ঠিক সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ ক্রেতা-বিক্রেতাকে মাস্ক পরতে দেখা গেছে। এ ছাড়া শপিং মলসহ ব্যান্ড শপগুলোতে গতকাল শুক্রবারও ঢুকতে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়া ফুটপাতেও ছিলে উপচেপড়া ভিড়। পাশাপাশি মার্কেটের পাশের সড়কগুলোতে থেমে থেমে সৃষ্টি হচ্ছিল গাড়ির জটলা। মার্কেট খোলার প্রথম দিনেই মার্কেটে যেতে ‘মুভমেন্ট পাস’ প্রয়োজন হবে বলে পুলিশ দাবি করলেও এ নিয়ে তাদের বিশেষ কোনো তদারকি দেখা যায়নি।

গত বৃহস্পতিবার ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ৯টা ৩০ মিনিট, তখন বেশ জমজমাট দেখা গেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে বসুন্ধরা শপিং মল এলাকার আশপাশের ফুটপাতের রাস্তা। বিক্রেতাদের দম ফেলার ফুসরত নেই। ঈদের আগে গতকাল ছিল শুক্রবার শেষ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই শপিং মলগুলোতে সকাল থেকে দলে দলে ভিড় করেছেন ক্রেতারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নেয় ক্রেতাদের মিলন মেলায়। দুপুরে রাজধানীর আসাদ গেটে আড়ং শপিং মলের সামনে দেখা যায়, ভেতরে ঢুকতে সারিবদ্ধভাবে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। বসুন্ধরা সিটিতেও একই অবস্থা। বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে চলে যাচ্ছেন। বসুন্ধরা শপিং মলে পরিবার নিয়ে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেহেদী হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকাল ১০টার সময় মার্কেটে প্রবেশ করেছেন, তখন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা গেছে। তবে বের হওয়ার সময় তা মানা সম্ভব হয়নি। প্রচুর মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক মিটারের মধ্যে চারজন করে লোক ছিল পুরো গ্রাউন্ড ফ্লোরে। ‘শঙ্কা’ নিয়েই বের হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিনই আমাদের কোথাও না কোথাও যেতে হয়। তবে সবার উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

এদিকে মধ্যবিত্তের কেনাকাটার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া এলাকায়ও গতকাল ছিল উপচেপড়া ভিড়। মার্কেট ও ফুটপাতে দুই জায়গাতেই ছিল ক্রেতাদের সরব উপস্থিতি। বলাকা সিনামা হলের পাশেই অবস্থিত অ্যাপেক্স জুতার শোরুম। বিকেল ৫টায় পুরো শোরুমে ছিল ক্রেতাদের সরব উপস্থিতি। প্রতিষ্ঠানটির বলাকা শাখার ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেচা-বিক্রি আজকে একটু ভালো। এত দিন তেমন বিক্রি হয় নাই।’ কত সময় পর্যন্ত দোকান খোলা রাখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগারোটা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত খোলা রাখছি। এরপর রাখতে দেয় না। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে।’

কথা হয় ফুটপাতের কাপড় ব্যবসায়ী রাব্বি হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা এখন একটু বাড়ছে। এভাবে চললে ভালোই।’ কয়টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগারোটা বা তার বেশি সময় ১২টা পর্যন্ত খোলা রাখতেছি।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিউ সুপার মার্কেটের সভাপতি শহীদ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেচাবিক্রি ভালো।’ রাত ১২টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো অঘোষিতভাবে চলছে। সব মার্কেট ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ঈদের কয়েক দিন বাকি, সরকার তেমন কড়াকড়ি করছে না। তাই ব্যবসায়ীরা খোলা রাখছেন।’

বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিসা রুমি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শপিং মলে সামাজিক দূরত্বের কোনো বালাই ছিল না। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ আসছিল। তবে শপিং মলে প্রবেশের সময় মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেয় নাই। করোনা সংক্রমণ কমে এলেও যে হারে এত মানুষ একসঙ্গে উপস্থিত হচ্ছে তাতে আবার কিছুদিন পর করোনা বাড়বে বলে আমার ধারণা।’

পুরান ঢাকার মার্কেট, শপিং মল, বিপণিবিতানগুলোয় বন্ধের দিন হওয়ায় গতকাল বেচাকেনা বেড়েছে। ইসলামপুরের ব্যবসায়ী মো. সাগর বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা মূলত পাইকারি হলেও এখন পাইকারি বেচাকেনা করতে পারছি না। বিভিন্ন জেলা থেকে যারা পাইকারি মাল কেনাকাটা করতে আসত, তারা এখন আন্তঃজেলা বাস বন্ধ থাকায় আসতে পারছে না।’

গ্রেট ওয়াল শপিং মলে কেনাকাটা করতে আসা সানজিদা বলেন, ‘পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে এখন আসলাম এই মার্কেটে। শুক্রবার হওয়ায় নিজের জন্য কিছু কেনাকাটা করলাম।’ তবে এখানকার মার্কেটগুলোয় তেমনটা স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানছে না বলে জানান এই ক্রেতা।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রথমে ৫ এপ্রিল থেকে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর ফলে সব দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরও কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু হয়। পরে আবার লকডাউনের সময় বাড়ানো হয়। তবে ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। পরে ক্ষুদ্র, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষতির কথা চিন্তা করে ২৩ এপ্রিল থেকে প্রথমে ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পরে ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।

এদিকে ২৩ এপ্রিল শপিং মল খোলার প্রথম দিনই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া সময় থেকে সরে আসে সরকার। প্রথম দিনের মাথায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, দোকানপাট বিকেল ৫টার পরিবর্তে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। তবে নতুন ‘লকডাউনের’ সময় বাড়ানোর প্রজ্ঞাপনের ফলে দোকান খোলা রাখার সময় আরও এক ঘণ্টা কমে এসেছিল।