এমনিতেই আমাদের দেশে বনভূমি এবং গাছ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। যেটুকু যা আছে, সেটুকুও সাবাড় করার আয়োজন চলছে চারদিকে। ১৯২৭ সালে বন আইন সংস্কারের সময় বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বনভূমির পরিমাণ ছিল মোট আয়তনের ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। এ পরিসংখ্যানও প্রশ্নাতীত নয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুন্দরবন ছাড়া সত্যিকারের বন বলতে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা ছিটেফোঁটা মাত্র। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা রাজধানী ঢাকা শহরের। এখানে যে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস, সে তুলনায় সবুজের পরিমাণ খুবই কম। যেটুকু যা আছে, সেগুলোও নিয়মিত কাটা পড়ছে। সর্বশেষ রাজধানীর ফুসফুস হিসেবে বিবেচিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনের গাছ কেটে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। নানা কারণ দেখিয়ে আমাদের দেশে গাছ কাটা হয়। এবার যেমন হয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে মতে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবগুলো প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৭টি রেস্তোরাঁ স্থাপন করা এবং সবুজ প্রান্তরে ‘ওয়াকওয়ে’ নির্মাণের কাজ করছে গণপূর্ত বিভাগ। এজন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণের (৩য় পর্যায়) মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব গাছ কাটা হচ্ছে।
ইট-সিমেন্টের এই ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি সুপরিসর সবুজ স্থান ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। পথ চলতে চলতে এখানকার সবুজ বৃক্ষরাজি বিমোহিত করে বহু মানুষকে। কর্মক্লান্ত বহু মানুষ এখানে হাঁটতে আসেন। আসেন বেড়াতে। এই শহরে এ যেন অক্সিজেন নেওয়ার একটি নির্মল জায়গা। কিন্তু, সেই অক্সিজেনের ভাণ্ডার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেক গাছ কেটে ফেলায় সেই ফুসফুসকেই ছিদ্র করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে হত্যা করায় গাছগুলোও কি কম কষ্ট পেয়েছে? মানুষ বা কোনো কোনো পশুকে মারলে তারা চিৎকার করে বলতে পারে, কিন্তু গাছ তা পারে না! যেভাবে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে, ওদের যদি কথা বলার ক্ষমতা থাকতো তবে ওদের চিৎকারে আর কানা পাতা যেত না!
অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ জানত, গাছের প্রাণ আছে। আমাদের বৈদিক সাহিত্যে এর উল্লেখ আছে। বৃক্ষদেবতা হিসেবে উল্লেখ অনেক প্রাচীন সাহিত্যে ও আদিবাসী সমাজে অনেক আগে থেকেই রয়েছে। এ ছাড়া প্রাণের ক্রমবিকাশে, এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উদ্ভবের যে চিত্র আমরা পাই, তাতেও কীভাবে ক্রমবিকাশের এক পর্যায়ে একটি শাখা উদ্ভিদ ও অন্য শাখা প্রাণীদের দিকে বিস্তৃত, তা স্পষ্ট দেখানো আছে। জগদীশ চন্দ্র বসু দেখিয়েছিলেন, উদ্ভিদেরও প্রাণীদের মতো সুখদুঃখের অনুভূতি আছে। এ ছাড়া উদ্ভিদ গরম, ঠান্ডা, শব্দ প্রভৃতিতে উদ্দীপিত হয়। তার আবিষ্কৃত ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’ যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি অতি সূক্ষ্মভাবে গাছের বৃদ্ধি মাপতে সক্ষম হন। প্রাণী ও উদ্ভিদের মাঝে অনেক সাদৃশ্যের প্রমাণও তিনি দেখিয়েছিলেন। যুগান্তকারী গবেষণা, সন্দেহ নেই। বিলেতের এক পত্রিকায় গবেষণার খবর প্রকাশ পাওয়ার পর কাগজে কার্টুন বের হয় মুলো খেতে মালি প্রবেশ করামাত্র সমস্ত মুলো ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
আসলে গাছের বোবা কান্না আমরা শুনতে পাই না। আর তা পাই না বলেই গাছের ওপর এমন যথেচ্ছাচার চালানো হয়। গাছ কেটে, সবুজ ধ্বংস করে রেস্তোরাঁ বানানো যে কতটা অপরিণামদর্শী উদ্যোগ, সেটা বলে বোঝানো না। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। মানুষকে মেরে ফেললে সেটা খুন। পশু মেরে ফেললে খুন। তাহলে গাছ মারলে কেন বিচার হয় না? গাছেরও তো প্রাণ আছে। কিন্তু প্রাণ থাকলেও গাছের যেহেতু প্রতিবাদ করার সামর্থ্য নেই, তাই তারা অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সবুজ ধ্বংস করে আত্মহত্যার পথে এগোচ্ছে ঢাকা। শহরজুড়ে রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, আবাসন তৈরির জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। এক জায়গায় গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিপূরক গাছ রোপণ করার আইন রয়েছে। কিন্তু তাও মানা হচ্ছে না। অপরিণামদর্শী উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রধান বলি হচ্ছে গাছ। আর ক্রমাগত গাছ কমে যাওয়ার কারণে আমরা ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। গাছপালা ও বনভূমি কমে যাওয়ায় গোটা দেশ একটা জ্বলন্ত উনুনে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমছে। উষ্ণতা বাড়ছে। বাড়ছে ধোঁয়া ও ধুলা। বাড়ছে দূষণ। এ নিয়ে অনেক কথা, অনেক আলোচনা, অনেক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে গত তিন দশক ধরে ঢাকা শহরে চলছে গাছ কাটার মহোৎসব।
আমাদের চারদিকের পরিবেশ আজ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আবহাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছ নেই। তাই বৃষ্টিও হচ্ছে না। বৃষ্টির অভাবে আমাদের নিত্য জীবন বিপর্যস্ত। শুধু এটাই নয়, প্রকৃতি, বিশেষত গাছপালার, সংস্পর্শের অন্যান্য অনেক উপকারী প্রভাবও রয়েছে আমাদের জীবনে। চোখের আরাম, মনের শান্তি, নিজের সঙ্গে একাত্মতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া, সব ক্ষেত্রেই প্রকৃতি ও পরিবেশের ভূমিকার গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন মনোবিদরা বারবার। তথাকথিত উন্নয়ন থেকে শুরু করে প্রোমোটার এবং চুরির এক বিরাট চক্র আছে বৃক্ষনিধনের পেছনে। উন্নয়ন প্রসঙ্গে একটাই কথা বলার, কেমন করে গাছ বাঁচিয়ে রাস্তাঘাট, রেললাইন ইত্যাদি হবে, তা অবশ্যই ভাবতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে। মানুষের সচেতন ও সোচ্চার হওয়াও সমান জরুরি। বৃক্ষ নিধন ও রোপণ প্রসঙ্গে সময় একটা খুব বড় অঙ্ক। একটা ৫০ কিংবা ১০০ বছরের পুরনো গাছ কেটে, নতুন গাছ লাগিয়ে আবার তো সেই ৫০ কিংবা ১০০ বছরের অপেক্ষা। এই মাঝখানের সময়টায় পরিবেশকে কে রক্ষা করবে? কে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে সাহায্য করবে আমাদের? এর উত্তর কারও জানা নেই।
মানুষের অন্তহীন লোভের থাবা সর্বত্র প্রসারিত। এই প্রসারণ ক্রমবর্ধমানও বটে। আর এটা চলেও আসছে সেই ইতিহাসের কাল থেকে। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ রাজের আদেশে ভূমিপুত্রদের অরণ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলো। এই নিষেধাজ্ঞা জারির উদ্দেশ্য ছিল, ঠিকাদার ও জমিদারদের হাতে জঙ্গলমহালের ইজারা তুলে দেওয়া ও নিজেদের আর্থিক স্বার্থরক্ষা। হাজার হাজার বছর ধরে অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনযাত্রার গতিমুখ গেল বদলে। মানুষ বা গাছপালা, শেকড় উপড়ালে বাঁচা তো সবার জন্যই কঠিন। সেই ইতিহাসের পরিবর্তন হয়নি। পরিবেশের ভারসাম্য আমরা নিজে হাতে নষ্ট করে চলেছি। প্রাচীন গাছ হলো পরিবারের প্রবীণ মানুষের মতো। পরিবেশ রক্ষা থেকে বন্যপ্রাণীর আহার, পাখপাখালি, কীটপতঙ্গের বাসস্থান। গাছ নেই তো কিছুই নেই। চারাগাছ লাগিয়ে ‘অরণ্য সপ্তাহ’ পালন খুব ভালো কথা। কিন্তু সেই চারা বড় হওয়ার আগেই তার পরিবারকে, অর্থাৎ বড় গাছকে ধ্বংস করে দেওয়া আসলে পৃথিবীকে ধ্বংস করার প্রথম অধ্যায়। আমরা সচেতনভাবে সেটাই করে চলেছি।
সম্পূর্ণ জীবজগৎ একে অপরের সঙ্গে কোথাও একটা সূত্রে বাঁধা। সেটা জীবনচক্র। মানুষ ও উদ্ভিদ, উদ্ভিদ ও পশু, সবারই সবাইকে প্রয়োজন। সেই কবে রবীন্দ্রনাথ বলাই ও তার গাছের গল্প শুনিয়েছেন আমাদের। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তার মতো আর কে বুঝেছেন? গাছের সঙ্গে বলাইয়ের প্রাণের মেলবন্ধন ছিন্ন করে তাকে বিকল্প বন্ধু খুঁজে দেওয়া যায়নি। পৃথিবীর মানুষের জন্য গাছ সেই অবিকল্প বন্ধু। এই বন্ধুত্ব পরম যত্ন ও ভালোবাসা ছাড়া টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।
লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com