সুয়ারেজেই আবার পুড়ল ঘানার কপাল

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম

১৬ বছর আগের এক ট্র্যাজেডির ক্ষত আজও দগদগে ঘানার ফুটবলে। ২০১০ সালের সেই রাতে ‘লুইস সুয়ারেজ’ নামের এক উরুগুইয়ান স্ট্রাইকারের গোললাইন হ্যান্ডবলের কারণে বিশ^কাপ সেমিফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছিল ব্ল্যাক স্টারদের। দীর্ঘ দেড় দশক পর ফুটবল বিশ^মঞ্চে ঘানা যখন আবার নকআউট পর্বের মুখোমুখি, তখন তাদের সামনে আবারও দেওয়াল হয়ে দাঁড়াল সেই একই নামের এক ফুটবলার। তবে এবার তিনি উরুগুয়ের নন, কলম্বিয়ার স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ। ম্যাচের শুরুর দিকেই বদলি হিসেবে স্পোর্টিং সিপির এই ফরোয়ার্ডের আকস্মিক প্রবেশ এবং তার জাদুকরী অ্যাসিস্টেই মূলত কপাল পুড়ল ঘানার। কানসাস সিটির তীব্র দাবদাহে ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ^কাপের শেষ ১৬-এর টিকিট নিশ্চিত করে কলম্বিয়া।

ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়া এই ঘটনাটি অবশ্য আগে থেকে দুই দলের কোনো কোচেরই ছকে ছিল না। কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের উত্তপ্ত আবহাওয়ায় দুই দলের রণকৌশলই ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটে ওলটপালট হয়ে যায় চোটের তীব্র আঘাতে। ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিটে কলম্বিয়ার মূল স্ট্রাইকার জন কর্দোবা কুঁচকির চোটে পড়লে ডাগআউট থেকে তড়িঘড়ি নামানো হয় লুইস সুয়ারেজকে। এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই, ঠিক ১৩ মিনিটে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন ঘানার অন্যতম ভরসা রাইট-ব্যাক মারভিন সেনায়া।

ঠিক এই মাঠের ভেতরের আকস্মিক পুনর্গঠনের সুযোগটাই লুফে নেয় কলম্বিয়া। ঘানার রক্ষণভাগ যখন বদলি খেলোয়াড় নিয়ে নিজেদের সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই আঘাত হানেন সুয়ারেজ। ১৪ মিনিটে দানিয়েল মুনিয়োজের পাস থেকে বল পেয়ে সুয়ারেজ ডান প্রান্ত দিয়ে বক্সে এক নিখুঁত ক্রস বাড়ান। সেখানে ঘানার তরুণ রক্ষণভাগ নিজেদের মার্কারকে হারিয়ে ফেললে সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকা জন আরিয়াস আলতো ছোঁয়ায় বল জালে জড়ান।

ম্যাচের শুরুতেই গোল হজম করে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া ঘানা পুরো ম্যাচে আর খেলায় ফিরতে পারেনি। দলটির অভিজ্ঞ পর্তুগিজ কোচ কার্লোস কুইরোজ ম্যাচের পর দলের এই অনভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ সচেতনতার অভাবকে দায়ী করে বলেন, ‘আমি খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমাদের কিছু খেলোয়াড় ভীতিগ্রস্ত ছিল। চাপ যখন বাড়ে, তখন তারা শান্ত এবং সংযত থাকতে পারেনি। এটি খুবই তরুণ একটি দল। আমাদের আরও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, কিছু খেলোয়াড়ের পরিপক্বতা অর্জনের জন্য সময়ের প্রয়োজন।’

কোচের সেই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা গেছে মাঠের পরিসংখ্যানেও। পুরো ম্যাচে ঘানা আটটি শট নিলেও কলম্বিয়ার জমাট ডিফেন্সের কারণে একটি শটও অন-টার্গেট রাখতে পারেনি। উল্টো কলম্বিয়ার তারকা লুইস দিয়াজের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল না হলে এবং ঘানার গোলরক্ষক লরেন্স আতি-জিগি একাই সাতটি চমৎকার সেভ না করলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত।

এদিকে খেলোয়াড়দের চোট আর প্রচণ্ড গরমের ধকল সামলে এমন জয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কলম্বিয়ার কোচ নেস্তর লরেঞ্জো। দলগত সংহতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘ফুটবল একটি দলীয় খেলা। শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ছোট ছোট গ্রুপ কাজ করে, তবে দল হিসেবে আপনাকে একটা একক ইউনিট হতে হবে। আমাদের দল শুরু থেকেই সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।’

এই জয়ের ফলে কলম্বিয়া আগামী মঙ্গলবার ভ্যাঙ্কুভারে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। তবে দারুণ এই জয়ের পরও কলম্বিয়ান উইঙ্গার লুইস দিয়াজ অবশ্য এখনই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে রাজি নন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো কিছুই জিতিনি। এই ম্যাচগুলো অত্যন্ত কঠিন। আমরা দেখেছি প্রতিটি ম্যাচই খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে। ইতিবাচক দিক হলো আমরা খুব ভালো খেলছি, আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।’

লুইস দিয়াজের এই সংযত মন্তব্যই যেন মনে করিয়ে দেয়, কানসাস সিটির এই জয় কলম্বিয়ার জন্য কেবল একটি ধাপ অতিক্রম করা। মাঠের চোট, তীব্র গরম আর ছক ভাঙা-গড়ার খেলায় শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে পেশাদারত্বেরই। অন্যদিকে ঘানার জন্য বিদায়টি কষ্টের হলেও, তরুণ এই দলটির সামনে পড়ে রইল পরিপক্বতা অর্জনের দীর্ঘ পথ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত