জগদীশের দেশে উদ্ভিদ ও উদ্যানের বিষাদ

সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কেটে ‘রেস্তোরাঁ ও ওয়াকওয়ে’ নির্মাণের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায় নাগরিক পরিসরে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে ঢাকার পরিবেশ-প্রকৃতির আলোচনা। পরিবেশবিদরা মনে করেন, যেকোনো শহরে অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ঢাকা মহানগরে সবুজ অঞ্চলের পরিমাণ পুরনো অংশে মাত্র ৫ শতাংশ এবং নতুন অংশে মাত্র ১২ শতাংশ। খেয়াল করা প্রয়োজন, অনুপাত অনুসারে প্রয়োজনীয় সবুজ এলাকার অভাব কেবল ঢাকা মহানগরেই নয় সারা দেশেই ক্রমাগত কমছে। ১৯২৭ সালে বন আইন সংস্কারের সময় বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বনভূমির পরিমাণ ছিল মোট আয়তনের ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে মাত্র ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আর সবুজের অভাবের অনিবার্য ফল হিসেবে বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থাও তাই একেবারে নিচের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স’ বা ‘ইপিআই’ সূচকে ২০২০ সালে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম।

শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘‘কংক্রিটের ‘শোভায়’ হারাচ্ছে সবুুুজ’’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে ঢাকার পার্কগুলোতে উন্নয়নের নামে পরিবেশ-প্রকৃতি বিনাশী কংক্রিটের জঞ্জাল নির্মাণের নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, পরিকল্পিত সবুজায়নের অংশ হিসেবে ‘অপ্রয়োজনীয়’ গাছ কাটা হচ্ছে এবং নতুন পরিকল্পনায় বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আগের চেয়ে বেশি সবুজ হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এছাড়া জনসমাগমে উন্নত মানের খাবার সরবরাহে তৈরি হচ্ছে সাতটি ফুড কিয়স্ক। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য শৌচাগার ও বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার শেড ও টিকিট কাউন্টার হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশবিদ-স্থপতি-নগরপরিকল্পনাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের এই উন্নয়নপরিকল্পনা কেবল পরিবেশবিধ্বংসীই নয়, তা একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের স্মৃতিস্থানসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে নির্মিত স্বাধীনতাস্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর সমেত পুরো প্রকল্পটির সঙ্গেই বেমানান।

দেশ রূপান্তরের সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরের অভ্যন্তরে উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রমনা পার্কেও চলছে বিতর্কিত নির্মাণযজ্ঞ। রমনার প্রায় ৯ একর আয়তনের লেকটির দুই পাড় ঘিরে ফেলা হচ্ছে মাইক্রো পাইল ও আরসিসি ফ্রেমের পাটাতন দিয়ে। লেকের ভেতর বানানো হচ্ছে কয়েকটি আইল্যান্ড, দুটো ব্রিজ আর ১১টি কফি কর্নার। পথচারীর হাঁটার জন্য ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার ফুটপাতে বসানো হচ্ছে সিরামিক ইটের পেভিং। একইসঙ্গে বানানো হচ্ছে তিনটি গণশৌচাগার। প্রায় দুই দশক আগে নাগরিক আন্দোলনে রক্ষা পাওয়া ২৯ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যানেও এখন চলছে গাছ কেটে নির্মাণযজ্ঞ। ২০১৮ সাল থেকে ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নামে একটি উন্নয়ন প্রকল্প চলছে সেখানে। স্থায়ী স্থাপনায় ফুডকোর্ট, প্যাডেল বোট, ভলিবল ও ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা এবং বড় টেলিভিশন স্ক্রিন ও মিউজিক সিস্টেমও রয়েছে নির্মাণাধীন প্রকল্পটিতে। সম্প্রতি ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন ‘জলসবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের নামে ১১টি পার্কে উন্নয়নে কাজ শেষ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, চারদিক প্রাচীরে ঘিরে কংক্রিট ও লোহালক্কড় বাড়িয়ে ব্যায়ামাগার, কফি হাউজ, গণশৌচাগার, এমনকি এটিএম বুথ বসিয়ে এসব পার্কের ‘সামাজিক চরিত্র’ বদলে ফেলা হয়েছে।

১৯৭৩ সালে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ঘোরদৌড় বন্ধ করে সেখানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উদ্যানসৃষ্টির সূচনা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেবল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধই নয়, ঢাকার এই ভূগোলে একইসঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের মতোই সাংস্কৃতিক জাগরণ ও চর্চাতেও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার এই প্রাণকেন্দ্র। স্মরণ করা প্রয়োজন, রমনার বটমূলে স্বাধীনতার আগে থেকেই চলছে পহেলা বৈশাখের মাঙ্গলিক প্রভাতি অনুষ্ঠান। তিন দশক আগে শুরু হওয়া চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয় এই এলাকাতেই। আর বাংলা একাডেমির ‘একুশের বইমেলা’র মূল ভেন্যুই হয়ে উঠেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কিন্তু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অভ্যন্তর দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে মেট্রোরেলের রুট নির্মাণ এবং পার্কে-উদ্যানে এসব বিতর্কিত নির্মাণ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও আমাদের জাতীয় চেতনার সঙ্গে কতটা মানানসই সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এসেই তার অধোগতি নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। নিজেদের চিনতে পারলে কি জগদীশ চন্দ্র বসুর দেশের মানুষ হয়ে আমরা প্রাণ ও প্রকৃতির বিষয়ে এতটা উদাসীন হতে পারতাম? আধুনিক মানবসভ্যতাকে জগদীশই দেখিয়েছিলেন যে, উদ্ভিদেরও প্রাণীদের মতো সুখদুঃখের অনুভূতি আছে এবং উদ্ভিদ গরম, ঠান্ডা , শব্দ প্রভৃতিতে উদ্দীপিত হয়। উন্নয়নবাণিজ্যের বিপরীতে আত্মোপলব্ধি ঘটাতে পারলে, চারদিকে নদীঘেরা রাজধানী ঢাকার এই প্রাণকেন্দ্রে আমরা অনন্য উদ্যান সৃজন করতে পারি। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে কিম্ভূত নির্মাণ বন্ধ করে, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিদেশি বিষবৃক্ষ না লাগিয়ে, ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেশীয় ফুল-ফল-বৃক্ষলতায় ঢাকার উদ্যানগুলো হয়ে উঠতে পারে অগণিত পাখি-পোকামাকড়-কীটপতঙ্গের অনন্য বাস্তুসংস্থানের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।