বাংলাদেশে দুজনের শরীরে দ্রুত সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন করোনার ভারতের একটি ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে। ভারত থেকে ফেরা ১৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় প্রথমে তিনজনের করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। পরে এই তিনজনের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করলে দুজনের শরীরে ভারতের ভেরিয়েন্ট শনাক্ত হয়। এই ধরনটির নাম ‘বি১.৬১৭.২’। এদের একজনের বাড়ি সাতক্ষীরা ও আরেকজনের বাড়ি খুলনা। একজন পুরুষ ও অন্যজন নারী। পুরুষের বয়স ১৭ বছর ও নারীর বয়স ৪০ বছর। প্রথমে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদের নেতৃত্বে সেন্টারের একদল গবেষক ও পরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে এই ভারতীয় ধরন শনাক্ত করে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের যশোর ২৫০ শয্যার হাসপাতালে মোট ১৬ জন রোগী ভর্তি আছে। এরা সবাই বাংলাদেশি ও বিভিন্ন সময় ভারতে গিয়েছিলেন। এই ১৬ জনের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করি। তিনজনের করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল। পরে সেই তিনজনের নমুনা সিকোয়েন্সিং করি। সেখান থেকে দুজনের শরীরে ভারতের যে ডাবল মিউটেন্ট এবং যে মিউটেন্টটি প্রথম মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে ছড়িয়েছিল, সেই মিউটেন্টটি আংশিক এবং পুরোটা পাওয়া গেছে। এরা সবাই চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। যে দুজনের শরীরে ভারতীয় ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে, তাদের একজনের বাড়ি সাতক্ষীরা ও আরেকজনের বাড়ি খুলনা। একজন পুরুষ ও একজন নারী। পুরুষের বয়স ১৭ বছর ও নারীর বয়স ৪০ বছর।’
এই গবেষক জানান, পূর্ণ সিকোয়েন্সটি জিআইএসএআইডির ওয়েবসাইটে (করোনাভাইরাসের জিনোমের উন্মুক্ত তথ্যভা-ার জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা) পাঠানো হয়েছে। গত শুক্রবার প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে ভারতের করোনার ধরন শনাক্তের খবর প্রকাশ করে। পুরো সিকোয়েন্সটি করা হয়েছে যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা দুবার আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা করি। শেষ পরীক্ষা করেছি ৬ মে। তারা সম্ভবত এপ্রিলের শেষের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং তখনই তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।’
এর আগে গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সম্প্রতি বেনাপোল বন্দর হয়ে ভারতফেরত কয়েকজনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন বিন্যাস বিশ্লেষণ করা হয়। তার মধ্যে দুটি নমুনায় ভারতীয় ভেরিয়েন্ট পাওয়া যায়।
গত ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশে করোনার নাইজেরিয়ার ধরনের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। দেশে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের শরীরে করোনার নাইজেরিয়ার ধরনের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। এর আগে যুক্তরাজ্য থেকে করোনাভাইরাসের আরেক নতুন ধরনের অস্তিত্ব দেশে পাওয়া যায়। রূপান্তরিত নতুন এই ধরন বাংলাদেশে শনাক্তের কথা গত ৫ জানুয়ারি আইইডিসিআর থেকে জানানো হয়। এরপর ফেব্রুয়ারিতে দেশে পাওয়া যায় করোনার দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন।
গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর.বি), সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল—এই তিন দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের তিনটি ধরন (ভেরিয়েন্ট) সবচেয়ে বেশি সংক্রামক।
ভারতে গত ফেব্রুয়ারিতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। দেশটি কিছুদিন ধরে করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুতে বিশে^ রেকর্ড গড়ছে। ভারতে কমপক্ষে তিনটি ভেরিয়েন্টের কারণে করোনা মহামারী মারাত্মক আকার রূপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে মৃত্যু ও শনাক্তের। গতকাল শনিবারও করোনাভাইরাস মহামারীতে এক দিনে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে দেশটিতে। সরকারি হিসাবে ভারতে এদিন মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ১৮৭ জনের। আর একই দিন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৪ লাখ ১ হাজারের বেশি মানুষ। ভারতে বর্তমানে মোট সক্রিয় রোগীর পরিমাণ ৩৭ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৬ জন। মোট মৃতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।
ভারতের নতুন ধরনের করোনা ভেরিয়েন্ট কোনোভাবেই যাতে বাংলাদেশে ছড়াতে না পারে, সে জন্য গত ২৬ এপ্রিল থেকে সীমান্ত ১৪ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ। গতকাল সীমান্ত বন্ধের সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানো হয়েছে।
২০ শতাংশ বেশি ও দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা : অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর জাহিদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ভারতের যে ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে তার নাম বি১.৬১৭.২। এই ভেরিয়েন্টের মাধ্যমে প্রধানত ২০ শতাংশ অতিরিক্ত সংক্রমণ হয়। অর্থাৎ সংক্রমণ সহজেই ছড়িয়ে যায়। আরেকটি দিক হচ্ছে, যারা ভ্যাকসিন নেবে, ওই ভ্যাকসিনের কারণে শরীরে যে অ্যান্টিবডি (করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরি হয়, সেটাকে পাশ কাটিয়ে ভাইরাস বেরিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া এই ভেরিয়েন্টের কারণে অ্যান্টিবডি পুরোপুরি কাজ করতে পারবে না। তার মানে ভাইরাস ছড়াতে থাকবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এই ভাইরাসের ২০ ভাগ সিভিয়ারিটি বেশি। বাংলাদেশ, চীনের উহানসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে যেসব ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে, সেগুলোর তুলনায় এটার দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা বেশি।
বাংলাদেশে ভারতের যে ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে, সেটার কারণে ভারতে মোট সংক্রমণের ২০ শতাংশ বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছেÑ জানিয়ে এই গবেষক বলেন, ভারতে ডবল ও ট্রিপল ভেরিয়েন্টও পাওয়া গেছে। এর দ্বারা সংক্রমণ হচ্ছে ২০ ভাগ মানুষের। এর আগে যুক্তরাজ্যে এই ভেরিয়েন্টের মাধ্যমে ৫৯ শতাংশ মানুষ সংক্রমিত হয়েছে।
এই ভেরিয়েন্ট নিয়ে অবশ্যই উদ্বেগ আছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, যারাই ভারত থেকে করোনা পজিটিভ রিপোর্ট নিয়ে আসবে, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে আইসোলেশনে রাখতে হবে। দুজনের একজনের বয়স ১৭ বছর। তার মানে এই ভেরিয়েন্ট কম বয়সীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতেও কম বয়স্কদের করোনা হচ্ছে। এমনকি এই ভেরিয়েন্ট যত বেশি ছড়াবে, তত বেশি এর ভেরিয়েশন হওয়ার সক্ষমতা বাড়ে। নতুন নতুন মিউটেশন হয়। ফলে সংক্রমণক্ষমতাও বাড়ে। ভারতে কমপক্ষে তিনটি ভেরিয়েন্ট এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে পাওয়া গেছে ‘২’ টাইপ। এ রকম আরও দুটি আছে ‘১’ ও ‘৩’ টাইপ। ‘৩’ টাইপ বেঙ্গল ভেরিয়েন্ট। এই তিনটির মধ্যে বেঙ্গল ভেরিয়েন্টটাই এখন পর্যন্ত বেশি মারাত্মক ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে আরও ১৪ দিন সীমান্ত বন্ধ : এদিকে ভারতের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশটির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আরও ১৪ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে উপস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) মাশফি বিনতে শামস বিকেলে গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ থাকলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম এর আওতামুক্ত থাকবে। এ ছাড়া ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে যাদের ভিসার মেয়াদ ১৫ দিনের কম, শুধু তারা বেনাপোল, আখাউড়া ও বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে দিল্লি, কলকাতা ও আগরতলার বাংলাদেশ মিশনের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। এর আগে গত ২৬ এপ্রিল ১৪ দিনের জন্য দেশটির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। তখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে যেসব বাংলাদেশির ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তারা ভারতে বাংলাদেশি দূতাবাসের বিশেষ অনুমতি নিয়ে দেশে ফিরছেন।
সতর্ক হওয়ার পরামর্শ : ভারতের ভেরিয়েন্ট প্রতিরোধে পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, ভারত থেকে যারাই পজিটিভ রিপোর্ট নিয়ে আসবে, বিমান বা স্থল বন্দর হোক, সবাইকে আইসোলেশনে রেখে ডবল নেগেটিভ হলে যেন তাদের ছাড়া হয়। তা না হলে যেকোনোভাবে সে সংক্রমিত হলে, সে অন্যদেরও সংক্রমিত করবে এবং ভেরিয়েন্টটি বাংলাদেশেও ছড়াবে। এমন ঘটনা দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের ক্ষেত্রে হয়েছে। আমাদের চারপাশে ভারতের সীমান্ত আছে; বিশেষ করে বেনাপোল দিয়ে প্রচুর মানুষ আসে। অন্য সাধারণ ভেরিয়েন্টের তুলনায় এই ভেরিয়েন্টের দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা বেশি। এ জন্য আমাদের নমুনা দেওয়া হলে ভারতের ভেরিয়েনটা ধারাবাহিকভাবে মনিটরিং করতে চাই। কারণ আমাদের ল্যাবের জিনোম সিকোয়েন্স করার পূর্ণ সক্ষমতা আছে।
এ ব্যাপারে গতকাল যবিপ্রবির জিনোম সেন্টার থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গবেষণাটি সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন যবিপ্রবির উপাচার্য ও জিনোম সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন। ইতিমধ্যে ভারতীয় ধরন শনাক্তের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আইইডিসিআর ও যশোরের স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। এ ধরনটি ভ্যাকসিন-পরবর্তী ‘সেরাম ও মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি’ এ ধরনকে কম শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে পারে।
গবেষক দলটি ভারত থেকে আসা সবাইকে পরপর দুইবার করোনা নেগেটিভ না হওয়া পর্যন্ত আইসোলেশনে রেখে পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত রোগীরা যেসব ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছে, তাদের অতিদ্রুত পরীক্ষা করা আবশ্যিক বলে মনে করে গবেষক দলটি। এ ছাড়া ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ায় সীমানা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো কারণে চালক ও সহকারীদের কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ার ফলে জরুরি সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশ^বিদ্যালয়ের জিনোম সেন্টার ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে।