করোনায় ক্ষতি পোষানোর চ্যালেঞ্জ বিচারাঙ্গনে

করোনা সংকটে বিচারাঙ্গনের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সীমিত পরিসরে বিচারপ্রার্থীদের কাছে ভার্চুয়াল আদালতই হয়ে উঠেছে ভরসাস্থল। আইনজীবীরা বলছেন, করোনার দীর্ঘ অভিঘাতে বিচারাঙ্গনে যে ক্ষতি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, তা পুষিয়ে উঠতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হবে। করোনাভীতির মধ্যে এখন বিচারপ্রার্থীর বিচার নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের মার্চের শুরুতে দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। মাঝামাঝি সময়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে, সংক্রমণ ঠেকাতে শেষদিকে প্রায় দুই মাস উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বিচারিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় কর্র্তৃপক্ষ। এক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল আদালতের যাত্রা শুরু হয়।

সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমে এলে ওই বছরের আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে অধস্তন আদালতে বিচার কার্যক্রম এবং উচ্চ আদালতে ভার্চুয়াল ও শারীরিক উপস্থিতিতে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম। এ সময় করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ও মামলাজট কমাতে সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের নানামুখী পরিকল্পনার মধ্যেই দেখা দেয় দ্বিতীয় ঢেউ। গত ৫ এপ্রিল থেকে ফের অধস্তন ও উচ্চ আদালতের নিয়মিত বিচার কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় কর্র্তৃপক্ষ। তবে আগের মতোই সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল আদালতে জামিন শুনানি, ফৌজদারি মামলায় নালিশি আবেদন, দেওয়ানি মামলায় আরজি দাখিলসহ কিছু কার্যক্রম চলছে। তবে বিচারাঙ্গন কবে এ পরিস্থিতি কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে তা নিয়ে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে বর্তমানে দেওয়ানি, ফৌজদারিসহ অন্যান্য বিচারাধীন মামলা রয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে ১৪ লাখ দেওয়ানি, ১৯ লাখ ফৌজদারিসহ প্রায় ৩২ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচারক সংকচ, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, পুরনো আইনে মামলার কার্যক্রম, সাক্ষীদের গড়হাজিরা, বিচার পদ্ধতি আধুনিক না হওয়া, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োগ কম হওয়ার কারণে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের বিচারে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরে উল্লেখযোগ্য হারে মামলা বাড়লেও নিষ্পত্তির হার খুবই কম। করোনাকালেও নিষ্পত্তি সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি মামলা হয়েছে। ফলে এক বছরে নিষ্পত্তির পথে থাকা মামলাগুলোর ভাগ্য এখন দীর্ঘসূত্রতায় আটকা পড়েছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, করোনা মহামারীতে দেশের বিচার বিভাগের বড় ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি সহসা পূরণ হবে না। যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে একদিকে সংক্রমণের ভয়; অন্যদিকে মামলাজট আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে। সব মিলে বিচার বিভাগ নিয়ে মহাপরিকল্পনা না হলে সামনে বিচারপ্রত্যাশীদের জন্য কঠিন সময় আসছে বলে মনে করেন তারা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে বিচার বিভাগসহ সব ক্ষেত্রে বড় আঘাত এসেছে। যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে শারীরিকভাবে নিয়মিত বিচারকাজ চালিয়ে নেওয়া কিছুটা দুরূহ, এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। বিচারকরা যেমন বিচার করার জন্য প্রস্তুত তেমনি বিচারপ্রার্থীদের মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীরাও প্রস্তুত। কিন্তু পরিস্থিতি যদি অনুকূলে না থাকে তাহলে তো করার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবু তো ভার্চুয়াল আদালত রয়েছে। সেখানে জামিনসহ জরুরি মামলার শুনানি হচ্ছে। কাজেই একেবারেই বিচারকাজ বসে আছে, থেমে গেছে এটা বলা যাবে না। তবে বিচারকাজের গতিটা একটু ধীর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে, এটি আশা করা যায়।’

গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে এ এম আমিন উদ্দিন দায়িত্ব নেন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, করোনায় বিচারকাজের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া, মামলাজট সহনীয় পর্যায়ে আনাসহ পিলখানা হত্যা মামলা, ২১ আগস্ট মামলা, রমনা বটমূলে বোমা হামলায় হত্যা মামলা, ষোড়শ সংশোধনীর মামলার মতো আলোচিত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি উদ্যোগসহ অধস্তন আদালতের যেসব মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে যাওয়া হবে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলায় নয়, সব মামলায় করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘায়িত হতে পারে। আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমাদের মামলার কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বাড়তি সময় লাগবে।’

সমাধান প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আইনজীবী সমিতি ও আইনজীবীদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে আমরা সবাই মিলে সুপ্রিম কোর্টকে যেন বলি, ছুটিগুলো (অবকাশ ও সাপ্তাহিক) কমিয়ে আনা হোক। সপ্তাহের একদিন ছুটি করা যায়, কোর্টের সময় দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়া যায়। প্রয়োজনে কিছু কাজ বেশি করে এটি করা যায়। কেননা এখন যে সমস্যা তৈরি হলো, সেটি শুধুমাত্র বিচারকদের পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। বিচারক ও আমরা (আইনজীবী) সবাই মিলে চেষ্টা করলে হয়তো অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব হবে।’

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের এক কৌঁসুলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় সংগত কারণে বিচার কার্যক্রমের গতি কমেছে। গত এক বছরে যখনই কোনো মামলায় দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই করোনার প্রকোপ বেড়ে যায়। অসংখ্য মামলা আটকা পড়ে আছে। চাঞ্চল্যকর কিছু মামলা যুক্তিতর্কের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে মামলাগুলো আরও এক, দুই মাস পিছিয়ে গেল। নিয়মিত আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে আরও সময় লাগবে মামলার শুনানির প্রক্রিয়া শুরু করতে। এখন বিচার কার্যক্রমে কবে স্বাভাবিক অবস্থা কবে ফিরবে, সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইনবিষয়ক মাসিক সাময়িকী ঢাকা ল’ রিপোর্টের (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি করোনায় সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে বিচার বিভাগের। গত বছরের মার্চ থেকে একপ্রকার অচলাবস্থা চলছে বলা যায়। নিয়মিত আদালত বসছে না। বিচারিক আদালত কিংবা উচ্চ আদালতে মূল যে মামলাগুলো, সেগুলো তো হচ্ছেই না। নতুন মামলা আরও যুক্ত হচ্ছে। আদালত বসতে না পারলে বিচার নিশ্চিতের প্রশ্ন আসে না। সবমিলে বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে আইনজীবীরাও ক্ষতিগ্রস্ত।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা মহামারীতে শুধু বিচার বিভাগ নয়, সব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতি কতটুকু, তা নিয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। ভেবেছিলাম এ বছর পরিস্থিতি ভালো হবে। কিন্তু সেটি হলো না। এখন ক্ষতি পোষানোর পদ্ধতি বের করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভার্চুয়াল আদালতে অন্তত কিছুটা হলেও বিচারপ্রত্যাশীরা বিচার পাচ্ছেন। কিন্তু মহামারীর যে অবস্থা, ভার্চুয়াল আদালত চালানোর মতো পরিস্থিতি থাকবে কি না সন্দেহ। তখন কী হবে? বিচার দ্রুত নিশ্চিত না হলে বিচারপ্রার্থীদের হতাশা বাড়ে। বিচার নিশ্চিতের জন্য তদন্ত ও বিচারের আয়োজনের ভিত্তিটা সরকারকেই বানাতে হয়। এই কয়েকটি জায়গায় যদি ভালো কিছু হয়, তাহলে বিচার দ্রুত নিশ্চিত হবে। তবে বিচার বিভাগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে অতীতে কোনো পরিকল্পনা হয়নি। আর এখন পরিকল্পনা নয় মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকার যদি এটি না করে তাহলে সামনে বিচারপ্রার্থীদের জন্য কঠিন সময় আসছে।’