সড়কপথে বাড়ছে চাপ বাড়ি ফিরতে তুচ্ছ সব

ঈদে বাড়ি ফেরার অদম্য ইচ্ছার কাছে একপ্রকার হার মেনেছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর পথের শত প্রতিকূলতা। দূরপাল্লার বাহন বন্ধ থাকলেও পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনা, ট্রাক কিংবা হেঁটেই বাড়ির পানে ছুটছেন ঢাকার কর্মজীবীরা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে রাজধানীর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো থেকে কোনো গাড়ি না ছাড়লেও মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে গিয়েই বিভিন্ন রুটে চোখে পড়েছে উল্টো চিত্র। আমিনবাজার, আব্দুল্লাহপুর, বাইপাইল, পোস্তগোলা সেতু, কাঁচপুর সেতু পার হয়েই দেখা যায় সড়কের দুই পাশেই সারি সারি বাস, লেগুনা, কার, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। সেই সব গাড়ির সহকারী বা চালকদের হাঁকডাকের আগেই ভরে যাচ্ছে সেগুলো। কয়েকগুণ বেশি ভাড়ায় বিনা আপত্তিতেই গাড়িতে উঠে বসছেন ঘরমুখো মানুষ। তাদের ভাষ্য, এত প্রতিকূলতার পরেও শেষ পর্যন্ত বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে পারবেন সেটা ভেবেই স্বস্তি পাচ্ছেন তারা। যার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে করোনার ঝুঁকি।

গতকাল সোমবার রাজধানীর গাবলতী বাস টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, সড়ক পথে মানুষের বাড়ি ফেরার মিছিল। ব্যাগ, লাগেজ, পরিবার পরিজন নিয়ে ঘরমুখো মানুষকে হেঁটেই গাবতলী থেকে আমিন বাজার ব্রিজ পার হতে দেখা যায়। প্রচ- রোদের তাপে শিশু এবং বৃদ্ধদের ক্লান্ত হয়ে পড়তে দেখা যায়। অনেকেই আবার রাস্তায় থেমে থেমে কথা বলছিলেন ভাড়ায় চালিত প্রাইভেটকারের সঙ্গে। দরদামে মিললেই শুরু হচ্ছে যাত্রা। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকলেও জেলার ভেতরে বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে সরকার। সরকারের এই অনুমতির সুযোগ নিয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা সারা দেশেই যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করছে। কোথাও কোথাও পুলিশ এসব পরিবহন আটক করলেও আবার সড়কের যানজট এড়াতে ‘মানবিক’ বিবেচনায় সেগুলো ছেড়ে দিচ্ছে। যার ফলে অতিরিক্ত ভাড়া খরচ করলে; ভোগান্তি থাকলেও ঘরমুখো মানুষ ঠিকই তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছেন। যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মাইক্রোবাস এবং প্রাইভেটকারের চালকদের ভাষ্য, ‘পথে বিভিন্ন জায়গায় তাদের পুলিশ ‘ম্যানেজ’ খরচ দিতে হয়। যার ফলে তাদের বাড়ার পরিমাণ বেশি।’ রংপুরের বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মৌ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে এই পরিস্থিতিতে আমি বাড়িতে আসতে চাইনি। তবে পরিবারের ইচ্ছায় অনেকটা বাধ্য হয়েই আমার এই ঈদযাত্রা। সকাল ৭টার পর কল্যাণপুর থেকে রওনা দেই। টাঙ্গাইল মহাসড়কে বেশ যানজট ছিল। গাবতলী থেকে যখন বের হচ্ছি তখন অনেককেই দেখছি হেঁটে রওনা দিয়েছে। আমিন বাজার ব্রিজ পার হয়ে তারা পিকআপে যে যেভাবে পারছে সেভাবেই বাড়ি যাচ্ছে।’ মৌয়ের ভাড়া করা গাড়িতে চালকের কাছে বিভিন্ন রকমের স্টিকার বানানো আছে। পুলিশের উপস্থিতি দেখলেই সিআইডি, পুলিশ, র‌্যাব বেশ কয়েকটা স্টিকার ব্যবহার করছে। স্বাভাবিক সময়ে ৫০০ টাকা খরচ করে দূরপাল্লার বাসে বাড়ি ফিরতে পারলেও এবার গুনতে গুনতে হয়েছে ২৫০০ টাকা।

এদিকে ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষ যেভাবে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাতায়াত করছে তা ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গত সোমবার বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘লকডাউনের সামান্য শিথিলতার সুযোগ নিয়ে দল বেঁধে এভাবে যাওয়া সুইসাইড সিদ্ধান্তের শামিল।’ করোনার সংক্রমণ রোধে ঈদে বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেকে যার যার অবস্থানে থেকে ঈদ করুন। একটা ঈদ বাড়িতে না করলে কী হয়। তিনি সবাইকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানান। সবাইকে বলব, নিজ নিজ অবস্থানে থেকে ঈদ করুন। কেননা বাড়ি যাওয়ার পথে কে ভাইরাস বহন করছেন, কে করছেন না, তা আমরা কেউ জানি না। কাজেই বাড়ি যাওয়ার পথে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বলব, বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কেননা যাওয়ার পথে আপনি ভাইরাস বহন করে নিয়ে যেতে পারেন আপনার পরিবারের কাছে।’

ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যাবেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হাসান। নিজের এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে ভাড়া করেছেন মাইক্রোবাস। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় চারগুণ টাকা খরচ করতে হয়েছে তার। কিন্তু বাড়ি ফিরতে পারায় আনন্দই ছিল হাসানের চোখেমুখে।  

সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এর মধ্যে ঘরের বাইরে গেলে মাস্কের ব্যবহার অন্যতম। কিন্তু সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকলেও জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে এখনো উদাসীনতা দেখা গেছে। এরপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে চলাচল সীমিত করা হয়, অফিসসহ নানা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। যদিও পরবর্তীতে শপিং মল থেকে শুরু করে শহরের মধ্যে গণপরিবহন চলাচল খুলে দেওয়া হয়। এখনো আন্তঃজেলা বাস বন্ধ আছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই। এই সময়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য ফেরিতে যে গাদাগাদি হয়ে মানুষ পার হতে দেখা গেল তা আগামী ১৪ দিন পরে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।