চট্টগ্রামে মিতু হত্যা

রিমান্ডে স্বামী বাবুল আক্তার খুনের কারণ খুঁজছে পিবিআই

চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যায় গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততার নতুন অনেক তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি মুসার কোনো খোঁজ না মেলায় ঠিক কী কারণে স্ত্রী মিতুতে খুন করান বাবুল আক্তার তার কোনো দিশা পাচ্ছে না পুলিশ।  তবে  বাবুলের শ্বশুর ও নতুন মামলায় বাদী মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেছেন, বাবুল ভিনদেশি এক  নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় মিতুকে খুন হতে হয়।

পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকা-ের কয়েক মাস পর পুলিশ সুপারের চাকরি হারিয়েছিলেন বাবুল আক্তার। এরপর মামলার তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছিলেন মিতুর বাবা-মা। হত্যাকান্ডে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পেয়ে বাবুল আক্তারকে চট্টগ্রামে পিবিআই কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় গত মঙ্গলবার। এরপর বুধবার পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন। ওই মামলায় সাবেক এসপি বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড অনুমতি পায় পিবিআই।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কী কারণে এই খুনÑএ দিকে সর্বোচ্চ নজর পিবিআইয়ের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেÑকী কারণে এই খুন? এছাড়া হত্যাকা-ের সঙ্গে আরও অন্যকিছুর যোগসূত্র আছে কি না তাও খতিয়ে দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ (রবিবার) রিমান্ডের শেষ দিন। আগামীকাল আসামিকে আদালতে হাজির করা হবে।’

বাবুল আক্তারের সহযোগী ছিল ৯ জন, হয়েছে অর্থ লেনদেনও : মাহমুদা আক্তার মিতুকে হত্যায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের সহযোগী ছিল ৯ জন। এ ছাড়া হত্যকান্ডের পর তিন লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বিকাশের মাধ্যমে। গত বুধবার আদালত প্রাঙ্গণে এসব তথ্য জানায় পিবিআই। এর আগে মঙ্গলবার রাতে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে হেফাজতে রাখে। মিতু হত্যায় বাবুলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানায় পিবিআই। এরপর মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন গত বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় নতুন একটি মামলা করেন। তার করা মামলার অপর আসামিরা হলেন বাবুলের ‘সোর্স’ কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসা, এহতেশামুল হক ভোলা, মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, মো. আনোয়ার, সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু, শাহজাহান ও কালু। এদের মধ্যে মুসা দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। মুসার পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ তাকে মিতু হত্যার পরপরই ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তবে পুলিশ তা অস্বীকার করছে।

এদিকে পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমরা বাবুল আক্তারের আচার-আচরণ বিশ্লেষণ করি এবং প্রত্যক্ষ করি। যে হত্যাটা হয়েছিল, সেখানে আর্থিক লেনদেনও হয়েছে। সেই লেনদেনের বিষয়টি আমরা আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জানতে পারি। আমরা জানতে পারি এ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বাবুল আক্তার এবং তার সঙ্গে ৯ জন সহযোগী ছিল।’

তিনি বলেন, ‘বাবুল আক্তারের একসময়ের ব্যবসায়িক পার্টনার সাইফুল হকের মাধ্যমে কয়েক দফায় বিকাশের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা লেনদেন হয়। কাজী আল মামুন ছিল খুনের মূল পরিকল্পনাকারী মুসার আত্মীয়। সাইফুল হক বাবুল আক্তারের টাকা মুসার আত্মীয় কাজী আল মামুনকে বিকাশের মাধ্যমে কয়েক দফায় দেন। মোট তিন লাখ টাকা দেওয়া হয় হত্যাকান্ডের পর। কাজী আল মামুন মুসা এবং তার স্ত্রীকে সেই টাকা প্রেরণ করেন। মূলত যে আর্থিক কন্ট্রাক্ট ছিল সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই টাকাটা দেওয়া হয়।’

প্রায় পাঁচ বছর আগে মিতুকে হত্যার পর বাবুল আক্তার নিজেই বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেছিলেন। সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ এই মামলাটির দায়িত্বে ছিল। এরপর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ওই মামলার তদন্তভার ন্যস্ত হয় পিবিআইয়ের কাছে।

পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাবুল আক্তারকে যেদিন প্রথম চট্টগ্রামে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল, সেদিন তিনি অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন একেকবার একেক ধরনের। ‘কী কারণে এই খুন’ এটিকে ‘অগ্রাধিকার’ দিয়েই তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এটি খোলাসা হলে সকল যোগসূত্র বের হবে।’

অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে মিতুকে খুন করানো অভিযোগ : বাবুল আক্তারকে আসামি করে নতুন মামলা করার পর মিতুর বাবা গত বুধবার দুপুরে মামলা দায়ের পরবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, বাবুল এক এনজিও কর্মীর সঙ্গে ‘পরকীয়ায়’ জড়িয়ে পড়ায় মিতুর সঙ্গে তার কলহ চলছিল। এর জেরেই তার ‘পরিকল্পনায়’ ২০১৬ সালের ৫ জুন প্রকাশ্যে রাস্তায় আমার মেয়ে মিতুকে হত্যা করা হয়। তার সোর্স কামরুল ইসলাম শিকাদার মুসা সেখানে ছিল। এটি বাবুলের পরিকল্পনায় হয়েছে।’

এ বিষয়ে পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকান্ডে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। মোটিভ অব ক্রাইম যেটা সেটা আরও বিস্তারিত তদন্ত করা প্রয়োজন রয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা কিছু ডকুমেন্ট পেয়েছি। গায়ত্রীর (এনজিও কর্মী) সঙ্গে তার (বাবুল) একসময়ের একটা সম্পর্ক ছিল। সেটার ডকুমেন্টস আমরা পেয়েছি। সেটা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে, ডকুমেন্টসটা আসলে গায়ত্রীর কি না। প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন আছে।’

জানা গেছে, গায়ত্রী নামের ওই নারী বর্তমানে জেনেভায় কর্মরত। ২০১৩ সালে বাবুল আক্তার যখন কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন; তখন ওই নারী জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশে (প্রতিরোধ শাখা) ফিল্ড অফিসার হিসেবে কক্সবাজারে কর্মরত ছিলেন। বাবুলের বাসা থেকে ওই নারীর (গায়ত্রী অমর সিং) উপহার দেওয়া দুটি বই এবং সেগুলোতে দুজনের সম্পর্কের বিষয়ে কলমে লেখা আছে বলেও মামলায় উল্লেখ করেন মোশাররফ।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘তদন্তে প্রয়োজন হলে ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। বইগুলো এবং বাবুল আক্তারকে পাঠানো এসএমএস মিতু যে খাতায় লিখে রেখেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।’

এদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার রানীরহাট এলাকা থেকে গত বুধবার রাতে সাইদুল ইসলাম সাক্কুকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৭। মিতুর বাবার করা হত্যা মামলায় সাইদুলকে আসামি করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চার দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত। সাক্কু এই হত্যাকান্ডের মূল সন্দেহভাজনদের একজন মুসার ভাই। মিতু হত্যার পর তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার যে মামলা করেছিলেন, সেই মামলার তদন্তে এই দুই ভাইয়ের নাম এসেছিল।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামের ওআর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মিতু। এ ঘটনায় তার স্বামী বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকা-ে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে আটক হন এহেতশামুল হক ভোলা ও তার সহযোগী মো. মনির। গ্রেপ্তার আনোয়ার ও মোতালেব মিতু হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তাদের স্বীকারোক্তিতে এ হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে পরিচিত মুসার নাম আসে। এরপর হত্যাকান্ডেব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহের অভিযোগে ১ জুলাই মুসার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু ও শাহজাহান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৫ জুলাই ভোরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ঠান্ডাছড়িতে নুরুল ইসলাম রাশেদ ও নুরুন্নবী নামে দুজন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এক পর্যায়ে ওই বছর ৬ সেপ্টেম্বর বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।