ঘোড়াশাল ৩য় ইউনিট রি-পাওয়ারিং

প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই গুনতে হচ্ছে সুদ

দুই বছরের প্রকল্প ছয় বছরেও শেষ করা যায়নি। আবারও মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর ফলে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে। তবে তৃতীয় মেয়াদেও প্রকল্প সমাপ্ত না হওয়ায় বিদেশি কঠিন শর্তের ঋণ পরিশোধের ফাঁদে পড়েছে সরকার। ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকার।

ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়াতে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রি-পাওয়ারিং প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এজন্য চীন থেকে ২ হাজার ১৯ কোটি টাকার বায়ার্স ক্রেডিট বা কঠিন শর্তের ঋণ নেওয়া হয়। একাধিকবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ার কারণে পরবর্তী সময়ে প্রকল্প ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকায়। সাধারণত কঠিন শর্তে নেওয়া এসব ঋণের গ্রেস পিরিয়ড কম থাকে। কিন্তু সুদের হার ও অন্যান্য শর্ত তুলনামূলক কঠিন থাকে। ঘোড়াশাল রি-পাওয়ারিং প্রকল্পটি দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। দুবার মেয়াদ ও একবার ব্যয় বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই সুদ গুনতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে ঋণের সুদবাবদ আলাদা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চলমান প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে আরও দেড় বছর সময় লাগবে। বিভিন্ন খাতে ব্যয়ও বাড়াতে হবে। এর মধ্যে বায়ার্স ক্রেডিট খাতে ১৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঋণ ফি বাবদ ব্যয় ৪ কোটি ৭৮ লাখ এবং নির্মাণকালীন সুদ বাবদ ১৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়া পরামর্শক সেবাও বাড়বে। প্রকল্পের প্রস্তাবের ওপর মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। পিইসি সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খান বলেন, ঋণের শর্ত মোতাবেক সুদ পরিশোধ করার বিষয়টি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) জানাতে বলেছি। প্রকল্প ঋণ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে ইআরডির মতামত নিয়ে পুনর্গঠিত আরডিপিপিতে সংযুক্ত করতে হবে। এরপর প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হবে।

প্রকল্পে পরামর্শক সেবা খাতে ব্যয় ২ কোটি ৬২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ২৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াকে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং পরামর্শক সেবার পরিমাণ ১৯ দশমিক ৫ জনমাস বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ১৮ মাস বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ দশমিক ৫ জনমাস পরামর্শক সেবা বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হলে সভায় প্রকল্প পরিচালক বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পরামর্শক সেবার আওতায় ৪ জন পরামর্শক মোট ১৯ দশমিক ৫ জনমাস সেবা প্রদান করবেন।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বায়ার্স ক্রেডিটের শর্ত মেনেই ঋণ নিচ্ছে সরকার। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার কোনো উন্নতি হয়নি। সমস্যা পুরনো, বহু আগেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আলোচনা হলেও আশু কোনো সমাধান হয়নি। তিনি বলেন, এটা এক ধরনের ঋণঝুঁকি। প্রকল্প থেকে বেনিফিট আসতে শুরু করার আগেই যদি সুদ পরিশোধ করতে হয় তাহলে এটি দেশের ক্ষতি।

জানা গেছে, নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে ১৯৮৬ সালে স্থাপিত স্টিম টারবাইনের তৃতীয় বিদ্যুৎ ইউনিটের স্থাপনকালীন উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ২১০ মেগাওয়াট। ক্রমান্বয়ে এটির ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে ১৭০ মেগাওয়াটে নেমে যায়। দেশের বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ওই বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটটি কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করে রি-পাওয়ারিংয়ের মাধ্যমে এর উৎপাদন ক্ষমতা ৪১৬ দশমিক ৩ মেগাওয়াটে উন্নীত করার জন্য আলোচ্য প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।

প্রকল্পটি মোট ২ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা (জিওবি ৮৬ দশমিক ৭৮ কোটি, প্রকল্প ঋণ ২০১৯.৫৪ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব ৪১৩ কোটি) ব্যয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৭ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। এ প্রকল্পে বায়ার্স ক্রেডিট পদ্ধতিতে চীনের এইচএসবিসি ব্যাংক কর্তৃক অর্থায়ন করে। এরপর ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পটির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়। পরে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধিসহ কয়েকটি খাতের ব্যয় পুনঃপ্রাক্কলন করে ২ হাজার ৯৫৮ কোটি ১৫ লাখ টাকায় (১৯৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, প্রকল্পঋণ ২ হাজার ৫৮৯ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব ১৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা) প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়টি অনুমোদিত হয়।

তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় নতুন করে প্রকল্পটির মেয়াদ ১৮ মাস বৃদ্ধি করে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং কয়েকটি খাতের ব্যয় পুনঃপ্রাক্কলন করে দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে।

ডিপিপিতে প্রকল্পটির মেয়াদ ১৮ মাস বৃদ্ধির প্রস্তাব করার কারণ হিসেবে কভিড-১৯ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রকল্পের কার্যক্রম ছয় মাস পিছিয়ে যাওয়া এবং পিজিসিবি কর্তৃক আলোচ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইকুয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৩০ কেভি ও উপকেন্দ্র সময়মতো নির্মাণ না করাকে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই উপকেন্দ্র ২০২১ সালের এপ্রিলে নির্মাণ সম্পন্ন হবে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব সভায় উল্লেখ করেন। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ১৮ মাস বৃদ্ধির প্রস্তাব যৌক্তিক মনে না হওয়ায় প্রকল্পের প্রস্তাবিত মেয়াদ কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সভায় অনুরোধ জানানো হয়। তবে সভায় সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, ইপিসি ঠিকাদার কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে ২০২২ সালের জানুয়ারি নাগাদ ইউনিটটি কমিশনিং করা যাবে মর্মে জানিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।