ট্রেজারি অফিসার এনডিসি রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর জাল করে পাঠানো চাহিদাপত্রের বিপরীতে গত ৬ মে ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি আসে মেহেরপুরে। বিষয়টি জানাজানি হলে দুদিন পর সেই স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি ঢাকায় ফেরত পাঠান মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক। কিন্তু ঘটনার ১২ দিন পার হলেও বড় ওই জালিয়াতিতে জড়িতদের চিহ্নিত বা তাদের বিরুদ্ধে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেই। ভুয়া চাহিদাপত্রে ঢাকার ডাক ভবন থেকে এত টাকার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি কীভাবে বের হলো, ট্রেজারিতে না ঢুকে তড়িঘড়ি কেন ডিসির গুদামঘরে ঢুকল, আবার ১৪ কোটির আড়ালে প্রকৃতপক্ষে কত কোটি টাকার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি এসেছিল বা কেন তদন্ত না করেই সেগুলো ফেরত গেল এসব প্রশ্নের সদুত্তর এখনো মেলেনি। বড় এই জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাবে কি না এই প্রশ্ন এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, পাচার হওয়া স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফিগুলো ছিল নকল। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে এগুলো মেহেরপুরে পাঠানো হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মুনসুর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মালগুলোর (স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি) বৈধতা অবৈধতা মন্ত্রণালয় জানে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মালামাল ফেরত দেওয়া হয়েছে। ভুয়া চাহিদাপত্রের মাল বুঝে নেওয়ার অপরাধে নাজির রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত এবং বিচারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে কেবিনেটে চিঠি দিয়েছি। নির্দেশ পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
ভুয়া চাহিদাপত্রে ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি পাচারের ঘটনায় সদর থানায় শুধুমাত্র একটি জিডি হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসক আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে সুপারিশ করেছেন। কিন্তু পুলিশ গত ১২ দিনে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ জিডির তদন্ত করছে। কেউ মামলা না করলে পুলিশ কীসের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী ডিসি অফিসের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ট্রেজারি কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষরে চাহিদাপত্র ই-মেইল ও ডাকযোগে কন্ট্রোলার, কেন্দ্রীয় ডাক ভবন বরাবর পাঠাতে হয়। চাহিদাপত্র যাচাই-বাছাই ও কয়েকটি বিভাগের অনুমোদনের পর সরকারি স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সরকারি গাড়িতে পাঠানো হয়। সেই স্ট্যাম্প এনডিসি ও ট্রেজারি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ট্রেজারিতে রাখা হয়। পরে দলিল লেখকদের মাধ্যমে বিক্রি করে সেই স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। গত ৬ মে ভুয়া চাহিদাপত্রে ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি পাচার হয়ে মেহেরপুর আসে। ডাক ভবনের গাড়িতে পৌঁছানো এ সমস্ত সামগ্রী দিনেই খালাস হয়। ওইদিন রাতে দ্রুত মালামাল খালাস করতে ডিসি অফিসে ছিলেন কয়েকজন কর্মচারী। ঢাকা জিপিওর নিম্নমান সহকারী (স্ট্যাম্পস) আবুল বাসার দেওয়ানসহ একজন চেকার ও গাড়িচালকসহ ৩ জন ওই স্ট্যাম্প-কোর্ট ফি নিয়ে মেহেরপুর যান। ডিসি অফিসের সহকারী নাজির (মেজবাবু) এসকে তৌহিদুল মালখানার দায়িত্বে। সেই ঘরের চাবি থাকে পিয়ন মো. মাসুদের কাছে। ট্রেজারির দায়িত্বে কর্মকর্তা আব্দুর রহমান। সেই কক্ষের চাবি থাকে পিয়ন সুফলের কাছে। অথচ সবার জ্ঞাতসারে রাজস্ব খাতের কোটি টাকার মালগুলো ট্রেজারিতে না ঢুকে নাজির (বড়বাবু) রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ঢুকে মালখানায়। দু’দিন পর রবিবার রফিকুল ইসলামের ট্রেজারিতে পুনঃযোগদান করার কথা ছিল। তখন গোপনে স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফিগুলো ট্রেজারিতে ঢুকিয়ে খাতা-কলমে সব বৈধ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সব জানাজানি হয়ে যায়। হুলুস্থুল পড়ে যায় প্রশাসনে। টনক নড়ে ডাক ভবন ও মন্ত্রণালয়ের। দুদিন ডিসি অফিস এলাকায় কড়া পুলিশ প্রহরা ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে কোনো তদন্ত বা মামলা ছাড়াই স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফিগুলো গোপনে ঢাকায় পাঠানো হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডাক ভবনের নিম্নমান সহকারী (স্ট্যাম্পস) আবুল বাসার দেওয়ান মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্যারদের নির্দেশে মাল নিয়ে গেছি। রাতে স্ট্যাম্প ট্রেজারিতে না ঢুকিয়ে মালখানায় ঢুকিয়ে জেলা পরিষদের বাংলোয় বিশ্রামে যাই। রফিক সাহেব আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তবে বাংলোয় গেলে আমার সন্দেহ হয়। তখন এনডিসি রাকিবুল ইসলামকে ফোন দিয়ে স্ট্যাম্প বুঝে পাওয়ার কথা বলি। এনডিসি বলেন, তিনি কোনো স্ট্যাম্প বুঝে পাননি। তখন নিজের বুদ্ধিতে ভুয়া চাহিদাপত্র, স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি পাচারের কথা উল্লেখ করে মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিই এবং সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করি। জিডি নম্বর-২৮৩। দুদিন পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মেহেরপুরের ডিসি মালগুলো ফেরত দেন।’
ভুয়া চাহিদাপত্রে কোটি টাকার সামগ্রী কীভাবে বের হলো এমন প্রশ্নের উত্তরে আবুল বাসার বলেন, ‘এটা বড় স্যাররা জানেন।’
আর ডাক ভবনের গাড়িচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘ঘটনার দিন রাজবাড়ীতে মাল নামিয়ে মেহেরপুর যাই আমরা। পরে শুনি মাল ভুয়া চাহিদাপত্রে আনা। রাতেই রফিক সাহেব পালিয়ে যান। পরে স্যারদের নির্দেশে মাল ফেরত নিয়ে ঢাকা পৌঁছাই।’ এভাবে স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি নিয়ে রফিকের লাভ কী এমন প্রশ্নের উত্তরে রহিম বলেন, ‘হয়তো কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়েছিল।’
যাচাই-বাছাই ছাড়া কী করে ডাক ভবন থেকে বিপুল অঙ্কের টাকার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি বের হলোÑ ডাক ভবনের সংশ্লিষ্ট চেকার মো. আলমগীরকে এই প্রশ্ন করলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) রাকিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারিভাবে চাহিদাপত্র দিলে যাচাই-বাছাই হয়ে অনুমোদন শেষে মাল পেতে এক মাস লাগে। অথচ এগুলো পৌঁছাতে ৭দিন লেগেছে। আমি অভ্যন্তরীণ বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’
ট্রেজারি প্রধান হিসেবে জিডি অথবা মামলা করলেন না কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এগুলো স্যাররা সিদ্ধান্ত নেবেন।’
আর ডাক বিভাগের আঞ্চলিক কর্মকর্তা (ডিপিএমজি), কুষ্টিয়া জোন খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশে ফেরতপত্রে স্বাক্ষর দিতে মেহেরপুর গিয়েছিলাম। এর বেশি কিছু জানি না।’
এদিকে নাজির রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তিনি পরিস্থিতির শিকার। চাহিদাপত্রে তার স্বাক্ষর নেই। থানায় মামলা হলে বা জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জড়িত কারা তা বলবেন।
মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘তদন্ত ছাড়াই আলামত মালামাল ফেরত পাঠানো ঠিক হয়নি। এতে মামলা করার সুযোগটুকুও থাকল না।’