গাজায় আরও ১২ হত্যা যুদ্ধবিরতি চান বাইডেন

রাত-দিনের তফাৎ নেই। মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে গাজা। সাত বছর পর ইসরায়েলের হামলায় ফের মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিনের শহরটি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রতিদিনই সেখানে মারা যাচ্ছে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ। ৯ দিন আগে থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল-হামাস সংঘাতে কেবল গাজায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ২১২ জন। ইসরায়েলের বোমার আঘাতে শহরটির পাঁচ শতাধিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে পুরোপুরি। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে এখনো নিখোঁজ অনেকে। প্রাণ বাঁচাতে ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। হামাসের রকেট হামলায়ও নিহত হয়েছে এক সেনা সদস্যসহ ১০ ইসরায়েলি। অশান্ত হয়ে উঠছে পশ্চিমতীর, সেখানেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে ২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি। গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দেশের নেতারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও যুদ্ধ শেষের কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো গত রবিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, হামাসকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত এই হামলা চলবে। নেতানিয়াহু অবশ্য এই জোর পাচ্ছিলেন জো বাইডেনের ‘আসকারায়’। তবে এইসব সংঘাতের ‘ফ্যাক্টর’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নেতানিয়াহুকে ফোন করে ‘যুদ্ধ’ থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এর মধ্যেই নতুন করে লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজায় পাঠানো বিভিন্ন দেশের সহায়তাও আটকে দিচ্ছে তারা। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে এবারের ঘটনার সূত্রপাত পূর্ব জেরুজালেমে। আরব অধ্যুষিত এ শহরের কেন্দ্রে রয়েছে আল আকসা মসজিদ মুসলমানদের কাছে মক্কা ও মদিনার পর সবচেয়ে পবিত্র স্থান। কয়েক সপ্তাহ ধরেই মসজিদের আশপাশে ফিলিস্তিনি ও ইহুদি যুবকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ শহরের শেখ জাররা এলাকায় কয়েক ঘর আরব পরিবারকে তাদের দীর্ঘদিনের পুরনো আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা চলছিল। তার প্রতিবাদে আরবরা সংগঠিত হওয়া শুরু করে, হামাসও জানিয়ে দেয় শেখ জাররা থেকে আরবদের বহিষ্কার করা হলে তারা বসে থাকবে না। এর জন্য ইসরায়েল সরকারকে তারা ১০ মে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দেয়। ইসরায়েল তার তোয়াক্কা না করলে গাজা থেকে একঝাঁক রকেট এসে পড়ে জেরুজালেমের উপকণ্ঠসহ দক্ষিণ ইসরায়েলের কয়েকটি শহরে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গাজায় শুরু হয় ইসরায়েলের বিমান হামলা, যে তাণ্ডবের মাত্রা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে।

হামাসের রকেট ছোড়ার পর যে লড়াই এখন শুরু হয়েছে তা থামানোর জন্য জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন দূত পাঠিয়েছেন ইসরায়েলে। দুদিন আগে তিনি প্রথম টেলিফোন করেছেন ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকেও। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, হামাসের সঙ্গে কথা বলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাতারকে মধ্যস্থতা করতে বলা হয়েছে।

নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত নিয়ে লন্ডনে রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ সাদি হামদি মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দিন দিন আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে যে পূর্ব জেরুজালেম এবং আল আকসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ইসরায়েল এখন মরিয়া এবং হামাস মনে করেছে ইসরায়েলকে প্রতিরোধের জন্য যেকোনো ঝুঁকি তাদের নিতে হবে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ইসরায়েলের বহুদিনের কৌশলই হচ্ছে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে নিজে থেকেই ফিলিস্তিনিরা চলে যায়। বেন গুইরান (ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা) নিজে তার জীবনীতে এই কৌশলের কথা লিখেছেন। অব্যাহত চাপের মুখে নানা সময়ে বহু জায়গা ফিলিস্তিনিরা ছেড়েও দিয়েছে। ব্যতিক্রম হলো পূর্ব জেরুজালেম এবং আল আকসা। ফিলিস্তিনিরা এখানে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে। কারণ, তারা মনে করে এই শহরটি হারালে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে।

তার মতে, জেরুজালেমে যা চলছিল তা নিয়ে রামাল্লায় ফিলিস্তিনি প্রশাসন তেমন সোচ্চার হয়নি। সৌদি আরব বা অন্য আরব মুসলিম দেশগুলো কম-বেশি চুপ ছিল। তুরস্ক কিছু মৌখিক বোলচালের বাইরে কিছু করেনি। আর এ কারণেই হামাস হয়তো মনে করেছে জেরুজালেম নিয়ে তাদেরই এখন কিছু করতে হবে। চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও তারা ইসরায়েলকে বার্তা দিতে চেয়েছে জেরুজালেম নিয়ে তাদের পরিকল্পনার পরিণতি রয়েছে।

তার মতে, এবারের সংঘাতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের যতটুকু না লাভ হবে তার চেয়ে বেশি লাভ হবে হামাস আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। তিনি বলেন, হামাস আবারও দেখিয়েছে প্রতিরোধে কার্যকরী। ইসরায়েলি আয়রন ডোম ভেদ করেছে তাদের রকেট। এই প্রথম তারা লড়াইকে সীমান্ত পেরিয়ে তেলআবিবে নিয়ে গেছে যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে দ্ইুপক্ষের মধ্যে যেকোনো মীমাংসার ধরন বদলাবে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলছেন, দেখ হামাস কত বড় হুমকি এবং তাদের হাত থেকে বাঁচতে হলে তাকেই প্রয়োজন। আবারও ভোট হলে তিনিই হয়তো জিতবেন।’ তার ধারণা, এ কারণেই হামাস বা ইসরায়েল কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক কোনো আহ্বানই কানে নিচ্ছে না। 

গতকাল মঙ্গলবার দুইপক্ষ হামলা-পাল্টাহামলায় জড়ায়। হামাস গতকালও দক্ষিণ ইসরায়েলে শতাধিক রকেট হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইসরায়েলও গাজায় বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। সোমবারও সেখানে অন্তত ১২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। 

এর আগে গত রবিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তৃতীয়বারের মতো ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের হামলার নিন্দা প্রস্তাব আনা হয়। বিবিসি জানায়, গাজায় ইসরায়েলের জঙ্গি বিমান থেকে ফেলা বোমায় শিশুসহ বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানির মধ্যে এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয়বার জরুরি বৈঠকে বসেছিল জাতিসংঘ। সেখানে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে অবিলম্বে অস্ত্রবিরতির আহ্বান-সংবলিত একটি যৌথ প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি আটকে দেওয়ায় এবারের বৈঠকও নিষ্ফল হয়।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও দুই দফায় নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা এবং অস্ত্রবিরতির আহ্বান-সংবলিত প্রস্তাব আটকে দেয় বলে খবর রয়েছে। এরপর রবিবারের ওই বৈঠক বসে।

ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দল ফাতাহর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার আলজাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানে তারা হতাশ। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ফোনে যে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রতিফলন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ঘটছে না।

সোমবারের আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছ থেকে হামলা বন্ধের জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যাচ্ছিল না। উল্টো শুরু থেকেই ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলে আসছিলেন তিনি।

সমালোচকদের পাশাপাশি বাইডেনের ডেমোক্র্যাট পার্টির অনেকেও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলাকে দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ করছেন।

এর মধ্যে সোমবার যুদ্ধবিরতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ওইদিন টেলিফোনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলাপকালে বাইডেন একটি যুদ্ধবিরতির পক্ষে নিজের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। আর আগে থেকেই চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশের তরফ থেকেও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে। 

তবে এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার মূল্যের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম অত্যাধুনিক অস্ত্রের সম্ভাব্য বিক্রিতে অনুমোদন দিয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে এখন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী হামাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চললেও যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা ওই অস্ত্র বিক্রি চুক্তিতে বাধা দেবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পর এ ধরনের বিক্রিতে বাধা দিতে চাইলে কংগ্রেস ১৫ দিন সময় পায়। যদিও এবার এমন কিছু হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, কেন্দ্রীয় আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী জেডিএএমএস চুক্তির মতো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরাসরি বিক্রি সংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত করা বা এ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধ আছে। বর্তমান সহিংসতা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্য অর্জনে আমরা কাজ করছি।