নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারে উপেক্ষিত আদালতের নির্দেশনা

প্রায় ১৬ বছর আগে রাজধানীর পল্লবী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। এ মামলায় ২০১২ সালের ১ অক্টোবর বিচারিক আদালতে আসামি সাহাবুদ্দিনের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়। পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। চার বছর পর ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি বাবার নামের মিলে পল্লবীর বেনারশি কারিগর মো. আরমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিরপরাধ আরমানকে তাৎক্ষণিক মুক্তি ও তাকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়। রায়ে আরমানের আটকাদেশ অবৈধ ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলা হয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে গত ১২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে ওই আদেশ স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে এটি আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। পুলিশের ভুলে জীবন থেকে পাঁচটি বছর হারিয়ে গেলেও প্রতিকার কিংবা ক্ষতিপূরণ পাননি আরমান।

প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অবহেলায় নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লংঘন, মৃত্যু কিংবা শারীরিক-মানসিক ক্ষতির প্রশ্নে প্রায়ই উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ কিংবা প্রতিকারে রায় ও আদেশ দেয়। তবে এসব নির্দেশনার বেশিরভাগ উপেক্ষিত থেকে যায়। প্রায় ৩০ বছর আগের একটিসহ উচ্চ আদালতে সাংবিধানিক ক্ষতিপূরণে আলোচিত সাতটি রায় ও আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাত্র একটি ঘটনায় নির্দেশনা আংশিক প্রতিপালন হয়েছে। বাকিগুলোর কোনোটির ক্ষেত্রেই আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালিত হয়নি। এমনকি আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট কাউকে জবাবদিহির খবরও শোনা যায়নি।

আইনজীবীরা বলছেন, সাংবিধানিক আইনে ক্ষতিপূরণের ধারণা ও এ-সংক্রান্ত টর্ট আইন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া, আইনি দীর্ঘসূত্রতা, রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বল ভূমিকা এবং বিবাদীপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার পেতে ভুক্তভোগীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর শাজাহানপুরের রেল কলোনিতে উন্মুক্ত পাইপে পড়ে মারা যায় শিশু জিহাদ। এ ঘটনায় চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের (সিসিবি) রিট আবেদনে হাইকোর্টের আদেশে ২০১৮ সালের আগস্টে জিহাদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষ। আইনজীবীরা জানান, বিগত কয়েক দশকে এই মামলাটি ব্যতিক্রম। এতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লংঘনে ক্ষতিপূরণের অর্থ সংশ্লিষ্টরা পেয়েছেন।

এ মামলার রিটকারী আইনজীবী সিসিবির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিহাদের আগে-পরে বেশ কিছু মামলা হলেও বেশিরভাগ ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ পাননি। ৩০ বছর ধরে ক্ষতিপূরণ মামলা চলছে। সাংবিধানিক আইনে ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে এতদিন তেমন ধারণা ছিল না। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও দায়বদ্ধতাতে সক্ষমতার অভাব রয়েছে। এসব ঘাটতি পূরণ না হলে প্রতিকার পেতে শুধু কষ্টই করতে হবে।’

আরমানের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীরা অসচ্ছল ও নিরীহ হন। তাদের পক্ষে অনেক আইনজীবী বিনা ফিতে মামলা লড়েন। বিপরীতে বিবাদীপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় যে কোনো উপায়ে তারা মামলা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেন। কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উদ্যোগও যথেষ্ট মনে হয় না। এজন্যই আরমানের মতো ঘটনাগুলোয় আইনি দীর্ঘসূত্রতা হয়।’

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির মামলার আসামি না হয়েও ৩ বছর জেল খাটেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। হাইকোর্টের নির্দেশে মুক্তি পান তিনি। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এক রায়ে জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্র্যাক ব্যাংককে নির্দেশ দেয়। ব্র্যাক ব্যাংকের আপিলে ঝুলে গেছে এ ক্ষতিপূরণ।

২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিনলাইনের একটি বাসের চাপায় পা হারান রাসেল সরকার (২৩)। পরে দুই দফায় রাসেলকে ১০ লাখ টাকা এবং চিকিৎসার জন্য ৩ লাখ টাকা দেয় গ্রিন লাইন কর্র্তৃপক্ষ। ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে রুলের শুনানি শেষে গত বছরের ১ অক্টোবর হাইকোর্ট রায়ে রাসেলকে আরও ২০ লাখ টাকা দিতে নির্দেশ দেয়। রাসেল সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত চিকিৎসার ৩ লাখসহ মোট ২৩ লাখ টাকা পেয়েছি। জানুয়ারিতে গ্রিনলাইন কর্র্তৃপক্ষ দুই মাসের মধ্যে বাকি ১০ লাখ টাকা দেবে বলেছিল। কিন্তু করোনার অজুহাতে তারা আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি।’

১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজধানীর শান্তিনগরে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি ট্রাকের ধাক্কায় মারা যান দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে তার স্ত্রী রওশন আখতার ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন। ২০০৫ সালের ২০ মার্চ ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত এক রায়ে ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে প্রতিষ্ঠানটিকে নির্দেশ দেয়। রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করলে ২০১০ সালের ১১ মে হাইকোর্ট রায়টি আংশিক সংশোধন করে ক্ষতিপূরণ ২ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা দিতে ডিক্রি জারি করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড লিভ টু আপিল করলে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণসহ আপিল নিষ্পত্তি করে রায়ে মন্টুর পরিবারকে ১ কোটি ৭১  লাখ ৪৭ হাজার ৮ টাকা দিতে বলে। কিন্তু মামলার পর ৩০ বছর পার হলেও মন্টুর পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি।

২০০৩ সালের ৮ জুলাই চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ‘এমভি নাসরিন’ লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহত ১২১ জনের পক্ষে ২০০৪ সালে ঢাকার একটি আদালতে ২৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ মামলা করে ব্লাস্ট (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট)। ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট আদালত এক রায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা রায়ের ৬০ দিনের মধ্যে দিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), সংশ্লিষ্ট লঞ্চ মালিক সমিতিসহ মামলার বিবাদীদের নির্দেশ দেয়। ২০১৭ সালের ৫ জুন হাইকোর্টেও বিচারিক আদালতের আদেশ বহাল থাকে। রায় স্থগিত চেয়ে বিআইডব্লিউটিএ ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর লিভ টু আপিল করে। এখনো তার নিষ্পত্তি হয়নি। বিআইডব্লিউটিএর আইনজীবী ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর থেকে আপিল বিভাগে অপেক্ষায় থাকলেও করোনার কারণে শুনানি সম্ভব হচ্ছে না।’

২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষিতে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীবের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়, পরে ১৬ এপ্রিল তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ২০ জুন রায়ে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে ২৫ লাখ করে মোট ৫০ লাখ টাকা রাজীবের দুই ভাইকে দিতে দুই মাস সময় দেয়।

রিট আবেদনকারী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। দুই বাস কর্র্তৃপক্ষ এখনো হাইকোর্টের আদেশ প্রতিপালন করেনি। আপিল বিভাগ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে দুই ভাইকে ১০ লাখ টাকা দিতে বললেও তা দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা ফাঁকি দিয়ে পার পাওয়ার প্রবণতা ও রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো খুবই অন্যায়। এ বিষয়ে আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সক্রিয় হতে হবে।’

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ,  এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। এক রিট আবেদনে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক রায়ে তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাস মালিক, চালক ও ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে নির্দেশ দেয়। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়। কিন্তু আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পায়নি তারেক মাসুদের পরিবার।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত যে নির্দেশনা দেয়, তা সংশ্লিষ্টদের প্রতিপালন করতে হবে। তারা না করলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বিষয়টি আদালতের নজরে আনবে। বিবাদীপক্ষের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে। নির্দেশনা না মানা তো আদালতকেই অবজ্ঞা করা। এক্ষেত্রে আদালতের শক্ত ভূমিকা নেওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করাও অধিকার। ভুক্তভোগীর স্বার্থেই আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’