রোজিনা, বিপন্ন সত্য আর দুর্বিনীত শক্তি

রোজিনা ইসলাম এখন শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি বিন্দুতে প্রতিফলিত সূর্যের আলোর মতো। তার কারণে আবার এক ঝলক দেখা গেল প্রশাসনের ক্ষমতার দাপট। অনেকটা বিদ্যুৎ চমকের মতো। বিদ্যুৎ চমক ক্ষণস্থায়ী কিন্তু এক ঝলকে দেখিয়ে দেয় অনেক কিছু। বিদ্যুৎ তীক্ষè তরবারির ফলার মতো মেঘ থেকে মাটিতে নেমে আসে, আলোর ঝলকানির পিছে পিছে আসে প্রচণ্ড শব্দ। আলো মুহূর্তে উদ্ভাসিত করে চারদিক আর শব্দ কানে তালা ধরিয়ে দেয়। কখনো কোনো সংবাদ আমাদের আলোড়িত করে অনেকটা বিদ্যুৎ চমকের মতো। প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা বলে যা মেনে নিচ্ছিল মানুষ তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে অনেক না জানা তথ্য। মানুষ চমকে উঠে বলে, এও কি সম্ভব! মানুষকে এই চমকে দেওয়ার কাজটা করেন সাংবাদিকরা। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বর্জ্যরে শব্দের ধাক্কাটা অবশ্য তারাই অনুভব করেন। এ যেন অনেকটা পুকুরে মাছ ধরার মতো। যত বড় মাছ তার লেজেও তত জোর। জনগণের সামনে রাঘববোয়ালের খবর দিতে গেলে তার লেজের বাড়ি খাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় সাংবাদিকদের। অবশ্য অনেকে বলেন, ঝুঁকি না নিয়েও নাকি বড় সাংবাদিক হওয়া যায়। তারা লিখে যা রোজগার করেন, না লিখে তার চেয়ে বেশি কামাই করেন। তারা বেশ কামিয়াব হয়ে যান পেশায় এবং পয়সায়। কিন্তু কিছু বেয়াড়া সাংবাদিকও তো আছেন, যাদের ভয়ডর একটু কম, যারা মাথাটা একটু সোজা করে রাখতে চান, তারা ঝুঁকি নেন এবং সমাজকে একটা ঝাঁকি দিয়ে যান। রোজিনা ইসলামের কাজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি তেমন একটা ঝাঁকি খাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন যে এত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন কর্তাব্যক্তিরা!

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কক্ষ থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি চুরির চেষ্টা এবং মোবাইলে ছবি তোলার’ অভিযোগে রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঢাকার শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়েছে, যেখানে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারায় চুরি এবং ১৯২৩ সালের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের’ ৩ ও ৫ ধারায় গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রীয় গোপন নথি নিজের দখলে রাখার অভিযোগ এনেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

যেসব ধারায় রোজিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে সে ধারাগুলোতে কী ধরনের শাস্তির বিধান আছে? দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় বলা হয়েছে কোনও ব্যক্তি যদি চুরি করে, তবে সে ব্যক্তি তিন বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।

দণ্ডবিধির ৪১১ ধারায় বলা হয়েছেÑ কোনও ব্যক্তি যদি কোনও সম্পত্তি চোরাই সম্পত্তি বলে জানা সত্ত্বেও বা তা চোরাই সম্পত্তি বলে তার বিশ্বাস করার কারণ থাকা সত্ত্বেও অসাধুভাবে অনুরূপ চোরাই সম্পত্তি গ্রহণ করে বা রেখে দেয়, তবে উক্ত ব্যক্তি তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।

সরকারি গোপন আইন ১৯২৩-এর ৩ ধারায় গুপ্তচরবৃত্তির জন্য শাস্তির বিধানের বিষয়ে বলা হয়েছে যে, (১) যদি কোনও ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা স্বার্থের পরিপন্থী উদ্দেশ্যে (ক) কোনও নিষিদ্ধ এলাকায় গমন করে, পরিদর্শন করে, অতিক্রম করে সান্নিধ্যে আসে অথবা ভেতরে প্রবেশ করে, অথবা (খ) কোনও স্কেচ, প্ল্যান, মডেল অথবা নোট তৈরি করে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শত্রুপক্ষের উপকারে আসবে বলে মনে হয়, ধারণা করা যায় অথবা নিশ্চিত হওয়া যায়, অথবা (গ) যদি কোনও ব্যক্তি শত্রুপক্ষের ব্যবহারে আসতে পারে, আসবে বলে ধারণা করা যায় অথবা নিশ্চিত হওয়া যায়, এমন কোনও অফিশিয়াল গোপন কোড অথবা পাসওয়ার্ড অথবা নোট অথবা অন্য কোনও দলিলপত্রাদি অথবা তথ্য আহরণ করে সংগ্রহ করে, রেকর্ড করে, প্রকাশ করে অথবা অন্য কোনও ব্যক্তির কাছে পাচার করে, তাহলে সেই ধারার অপরাধে অপরাধী হবে।

(২) ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধানসংবলিত এই ধারায় অভিযোগ আনার জন্য অভিযুক্ত যে কোনও একটি বিশেষ কার্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থীমূলক উদ্দেশ্যে করেছে, তার প্রমাণ প্রয়োজন নেই এবং উক্ত বিশেষ কার্যটি তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও, এই ধারায় তাকে শাস্তি প্রদান করা যাবে। যদি মামলার অবস্থা অথবা তার আচরণ অথবা তার জ্ঞান কার্যাবলী প্রমাণ করে যে, তার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যাহত অথবা নিষিদ্ধ এলাকা সম্পর্কিত কোনও বিষয়ের কোনও স্কেচ, মডেল, আর্টিকেল, নোট, দলিল বা তথ্য অথবা কোনও গোপনীয় কোড বা পাসওয়ার্ড তৈরি, আহরণ সংগ্রহ, রেকর্ড ও প্রকাশ করে বা আইনগত অধিকারপ্রাপ্ত না হয়ে পাচার করে।

যদি মামলার অবস্থা, তার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থী তাহলে ধরে নিতে হবে যে, উক্ত স্কেচ, গান, মডেল, আর্টিকেল, নোট, দলিলপত্র অথবা তথ্য তৈরি, আহরণ সংগ্রহ, রেকর্ড, প্রকাশ ও পাচার করা হয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থীমূলক উদ্দেশ্য।

৩ (ক) এ ধারার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে অপরাধটি বিদেশি শক্তির স্বার্থে বা প্রয়োজনে করা হয়েছে বলে ধারণা করা গেলে বা প্রমাণিত হলে অথবা অপরাধটি প্রতিরক্ষা সম্পর্কীয় বা গোপন অফিশিয়াল কোড সম্পর্কিত হলে, মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে, এবং (খ) অন্যান্য ক্ষেত্রে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

একই আইনের ৫ ধারায় তথ্যের বেআইনি হস্তান্তর সম্পর্কে বলা হয়েছে। বলা হয়েছেÑ (১) কোনও নিষিদ্ধ এলাকা ও সরকার ঘোষিত কোনও এলাকা সম্পর্কীয় কোনও গোপনীয় অফিশিয়াল কোড বা পাসওয়ার্ড বা স্কেচ, প্ল্যান, মডেল, আর্টিকেল, নোট, দলিলপত্রাদি অথবা তথ্যাদি কোনও ব্যক্তি আইনসংগত দখলে বা নিয়ন্ত্রণে থাকলে। (ক) সে যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে, আইনগত অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা আদালতের কাছে বা রাষ্ট্রের স্বার্থে অন্য কোনও ব্যক্তির নিকট ব্যতীত, অন্য কোনও ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে, অথবা; (খ) তার নিয়ন্ত্রণাধীন তথ্যাদি অন্য কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের শক্তির স্বার্থে বা দেশের নিরাপত্তার পরিপন্থীমূলকভাবে ব্যবহার করে, অথবা; (গ) আইনগত অধিকারের মেয়াদ শেষেও যদি তা নিজের অধিকারে রাখে বা (ঘ) যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক ফেরত প্রদানের বা হস্তান্তরের নির্দেশ পালন না করে অথবা তা সংরক্ষণে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে বা নিজেই এর নিরাপত্তা পরিপন্থী কার্য করে, (ঙ) তাহলে সে এ ধারার অপরাধে অপরাধী হবে।

(২) যদি কোনও ব্যক্তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হয়ে এ আইনের পরিপন্থী জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত তথ্যাদি গ্রহণ করে, সে এই ধারার অপরাধে অপরাধী হবে।

(৩) এই ধারার অধীনে অপরাধী ব্যক্তি নিম্নরূপভাবে দণ্ডনীয় হবেÑ (ক) উপধারা (১) (এ) এর অধীন পরিপন্থী কার্যাধির বা কোনও প্রতিরক্ষা নির্মাণকাজ, অস্ত্রাগার, নৌ, স্থল বা বিমানবাহিনীর স্থাপনা বা স্টেশন বা খনি, মাইনক্ষেত্র, কারখানা, ডকইয়ার্ড, ক্যাম্প বা বিমান বা গোপনীয় অফিশিয়াল কোড-সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হলে তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিদেশি শক্তির স্বার্থে বা সুবিধার্থে ব্যবহৃত হবে বলে অনুমেয়। তা হলে বা ধারণ করা গেলে মৃত্যুদণ্ডে অথবা চৌদ্দ বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(খ) অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে অথবা জরিমানা দণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

এসব অপরাধের সঙ্গে কি রোজিনা ইসলাম যুক্ত ছিলেন? মামলা অনুযায়ী তিনি ছিলেন। তাহলে বোঝা গেল তার অপরাধসমূহ ভীষণ জটিল। সঠিক সময়ে অতিরিক্ত সচিব এবং উপসচিবরা না দেখলে রাষ্ট্রের যে কি ভয়াবহ ক্ষতি হতো তা হয়তো ধারণাও করা যাচ্ছে না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই যে, যিনি সোনার মেডেলে খাদ মেশানোর কথা আমাদের জানিয়েছিলেন তাকে এখন চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার ও হেনস্তা হতে হলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির যেসব চিত্র ইতিমধ্যে গণমাধ্যমসমূহে প্রকাশিত হয়েছে তাতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মান দুটোই উন্নত হতো। কিন্তু যার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ৩৫০ কোটি টাকার জরুরি কেনাকাটায় অনিয়মের তথ্য, নিয়োগ নিয়ে কোটি টাকা ও পদোন্নতি বাণিজ্যের খবর, করোনায় জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম অবহেলায় ফেলে রাখা, করোনা পরীক্ষার কিট নিয়ে তথ্যবিভ্রাটের সংবাদ তাকে জনস্বার্থে পুরস্কৃত করার পরিবর্তে কারাবরণ করতে হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একটা বার্তা পৌঁছে গেল যে, দুর্নীতির খবর বের করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সাবধান! রিজেন্ট, জিকেজির দুর্নীতি, মিঠু আবজালের কোটি কোটি টাকা, স্বাস্থ্যের ডিজির গাড়িচালকের বুলন্দ দরজাসহ বাড়ি ও সম্পদের খবর আগে যা বেরিয়েছে ওই শেষ। আর না!

একটা কবিতা সামাজিক মাধ্যমে হয়তো শুনেছেন অনেকেই। ‘এত টিকা বের হয়, দুর্নীতির কোনো টিকা কি আছে? সেই কথাটা জানার জন্য পরান আমার নাচে।’ একটু ভাবুন তো, মাসে এক লাখ টাকা করে জমালে ১০ কোটি টাকা জমতে কত বছর লাগে। খুব কি জটিল হিসাব? হাওয়া খেয়ে টাকা জমালেও তো ৫০ বছরের বেশি লাগার কথা। তাহলে সরকারি চাকরি করে দেশে বিদেশে বাড়ি, বিদেশে সন্তানের লেখাপড়া, বিদেশি ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা কেমন করে হয়? এই প্রশ্নে দুর্নীতি ছাড়া আর কোনো উত্তর কি দেওয়া যাবে? এসব মহারথীর শক্তি যে কত, তা সাংবাদিকের গলা চিপে ধরা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আর অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট যদি মুখ বন্ধ করার কাজেই ব্যবহৃত না হয়, তাহলে এসব আইন আর কি কাজে লাগবে?