জলাবদ্ধতা থেকে যেন মুক্তি নেই চট্টগ্রামবাসীর। দল বদলায় ক্ষমতা বদলায়। নগরবাসী বারবার প্রতিশ্রুতি পায়। বদলায় না শুধু চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রামবাসীর দুঃখের নাম জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রামকে বলা হয় দ্বিতীয় রাজধানী। দেশের প্রধান বন্দরনগরী এটি। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ এখানেই অবস্থিত। বৃষ্টিতে জলবদ্ধতায় এ বাজারে বছরে ক্ষয়ক্ষতি হয় শতকোটি টাকার বেশি। সামান্য বৃষ্টিপাতেও নগরীর অধিকাংশ এলাকা ডুবে যায়। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি আর জোয়ারের পানির কারণে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদসহ অনেক এলাকায় প্রায়ই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই এ জলাবদ্ধতা। বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে নানা স্থাপনা গড়ে ওঠায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকা জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। বছর ধরে এ জলাবদ্ধতায় নাকাল হচ্ছে চট্টগ্রামবাসী।
চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হয়নি। আবার এ দুটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মেয়রদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে বিঘœ ঘটিয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ ১৯৯২ সালে তিনটি নতুন এবং ১৫টি শাখা খাল খননের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ২৯ বছরেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। এরপরও প্রতি বছরই পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ যে তেমন কিছু হয়নি, তার প্রমাণ গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবর। গত ১৪ মে ঈদের দিন মাত্র ঘণ্টাখানেক বৃষ্টিতেই নগরীর নিম্নাঞ্চলসহ বিভিন্ন অলিগলিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এ সময় বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও পানি ঢুকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নগরবাসীদের। যদিও ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের নির্মাণকাজ জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় স্তিমিত হয়ে আছে। প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে ৩৬টি খালের মাটি অপসারণে ২৮ কোটি ৮৫ লাখ ও মাটি খননে ২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা ভূমি অধিগ্রহণে ১ হাজার ৭২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, নতুন ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ৩১৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, ১৭৬ কিলোমিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য ২ হাজার ৬৪০ কোটি, ৪৮টি পিসি গার্ডার ব্রিজ প্রতিস্থাপনে ২৯৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়াও বন্যার পানি সংরক্ষণে ৩টি জলাধার, ৬টি আরসিসি কালভার্ট প্রতিস্থাপন, ৫টি টাইডাল রেগুলেটর, ৪২টি সিল্টট্রেপ স্থাপন, ২০০টি ক্রস ড্রেন কালভার্ট নির্মাণের কথা রয়েছে। ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রোড সাইড ড্রেনের সম্প্রসারণ, ৮৮০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং ৯২টি ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, ২ হাজার বৈদ্যুতিক পুল স্থানান্তরের কথা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) গত বছর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ৫১ শতাংশ শেষ হওয়ার কথা জানালেও এ বছর জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ এখন প্রায় বন্ধ বললেই চলে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা জমি অধিগ্রহণ করা না গেলে খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল, রাস্তা ও তিনটি জলাধার নির্মাণ করা যাবে না। এসব বাস্তবায়ন করা না গেলে এবারও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে না নগরবাসী। এমন অবস্থায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে। বিশ্বের কোথাও সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত ছাড়া কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, বিশেষজ্ঞের মতামত ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তা পূরণ হয় না। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও লুটপাটের সমস্যা তো রয়েছেই। জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে নতুন খাল ও শাখা খাল খনন করতে হবে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পগুলোর পুরোপুরি সুফল পেতে হলে নতুন খাল খনন এবং জলাধার স্থাপনের বিকল্প নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ অব্যাহত থাকলে বৃষ্টির মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। তাই সব নির্মাণের ক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখতে হবে এবং এ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। জবরদখল হয়ে যাওয়া খাল, ছড়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয় পুনরুদ্ধার করতে হবে। নগরবাসীর ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে চলমান প্রকল্পের কাজ যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তি যাতে আর না বাড়ে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।