যুদ্ধবিরতির পর গাজায় হামাসের বিজয় মিছিল

টানা ১১ দিন ধরে চলা ইসরায়েল-হামাসের মধ্যকার সংঘাতের অবসান হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে রক্তক্ষয়ী এ সংঘাতের অবসান হয় বলে জানিয়েছে বিবিসি। ওইদিন রাত ২টার দিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর গাজার হাজার হাজার বাসিন্দা রাস্তায় নেমে উল্লাস প্রকাশ করেন। ইসরায়েল ও হামাস দুপক্ষই দাবি করছে, এ লড়াইয়ে তাদের বিজয় হয়েছে।

এদিকে এ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিশ্বনেতারা। তাদের আশা এ যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। তবে দুপক্ষের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরেই গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বায়তুল আকসায় ইসরায়েলি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে এবারের সহিংসতায় ২৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৩২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০০ জনের বেশি নারী ও শিশু। আহত হয়েছে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি।

গতকাল রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, রমজান মাস শেষে বিশ্বজুড়ে ঈদ উদযাপিত হলেও গত সপ্তাহে সেই উৎসব ঠিকঠাক করতে না পারা গাজার অনেক বাসিন্দাকেই দেখা গেল বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে রাস্তায় নেমে এসে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে ১১ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে আসা যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় উল্লাস প্রকাশ করতে। গভীর রাতে শহরটির বিভিন্ন অংশে আরবিতে সেøাগান উঠল, ‘আল্লাহ মহান, তাকে ধন্যবাদ।’ প্রধান সড়কগুলোতে গাড়ির ভিড়, হর্নে কানে তালা লেগে যাওয়ার দশা, জানালা দিয়ে উল্লসিত মানুষের পতাকা ওড়ানো আগের সব যুদ্ধবিরতি বা বন্দিবিনিময়ের সময়ের মতো এবারও গাজাকে এমন উৎসবমুখরই দেখা গেছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শহরটির বিভিন্ন মসজিদের লাউডস্পিকারে হামাস যোদ্ধাদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। ঘোষিত হয় ‘সোর্ড অব জেরুজালেম যুদ্ধে দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিজয়’। উল্লসিত অনেককে দেখা যায় শূন্যে গুলি ছুড়তে। কেউ কেউ ব্যস্ত শব্দবোমা ফাটাতে কিংবা আতশবাজি পোড়াতে।

আনন্দিত অনেককেই এ সময় একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। অনেকে আবার সেøাগান দিচ্ছিলেন ইসরায়েলের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় থাকা হামাসের এক শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের নাম ধরে, দেড় সপ্তাহের যুদ্ধে যাকে মারতে তেল আবিবের বেশ কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে খবর স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর।

‘দখলদারদের বিরুদ্ধে এ এক অসাধারণ জয়। আমাদের প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করেছে। আজ থেকেই ঈদ শুরু হচ্ছে। অনেকে ঘরবাড়ি ও আত্মীয়স্বজন হারিয়েছেন। তা সত্ত্বেও আমরা উৎসব করব’ বলেছেন বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উৎসবে শামিল হওয়া ৩০ বছর বয়সী আহমেদ আমের।

ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়াকে নিজেদের ‘বিজয়’ হিসেবে দেখছে হামাস। দলটির এক নেতাকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, এটা ফিলিস্তিনি জনগণের ‘বিজয়’ এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘পরাজয়’। হামাস নেতারা এও বলেছেন, ঘোষণা এলেও যুদ্ধবিরতি চুক্তির খুঁটিনাটি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা সতর্ক অবস্থায় থাকবেন।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবুল ফাত্তাহ সিসিকে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি দুই পক্ষ মানছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য মিসরীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যাচ্ছেন।

মিসরের পাশাপাশি কাতার এবং জাতিসংঘও দুপক্ষকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর ভূমিকায় ছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি।

আল-আকসায় আবার সংঘাত : গতকাল জেরুজালেমের পুরনো শহর এলাকায় জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ও ইসরায়েলি পুলিশের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়েছে। ইসরায়েলি পুলিশ বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ‘নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই দাঙ্গা বাধে।’

বিবৃতিতে বলা হয়, কাছের এক ফটকে পুলিশ অফিসারদের লক্ষ্য করে কয়েকশ তরুণ পাথর এবং মলোটভ ককটেল ছুড়তে শুরু করে। জেরুজালেমের পুলিশ কমান্ডার ‘দাঙ্গাকারীদের ঠেকাতে’ পুলিশ অফিসারদের ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, পুলিশ অফিসাররা স্টান গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে।

বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, তার প্রশাসন ফিলিস্তিনে মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ‘ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মানুষের নিরাপদে জীবনযাপনের সমান অধিকার রয়েছে। সমান স্বাধীনতা আছে। এটাই সুযোগ, উন্নতির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার।’

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব টুইট করে বলেছেন, ‘এই যুদ্ধবিরতি যাতে দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেজন্য সব পক্ষকে কাজ করতে হবে। সহিংসতা এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। এ সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাজ্য শান্তির জন্য যেকোনো উদ্যোগকে সমর্থন করবে।’

মিসরের মধ্যস্থতায় এ যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। তাই মিসরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন বাইডেন। তারপরই মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসি বলেছেন, ‘যুদ্ধবিরতির পেছনে বাইডেনের অবদান প্রচুর।’

জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া : জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ১১ দিনের মারাত্মক সংঘাত শেষের ঘোষণাকে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন। গুতেরেস বলেছেন, ‘এ সংঘাত কেন হলো, তার মূল কারণ খুঁজতে হবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে। তাদের আলোচনা শুরু করতে হবে।’

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি বলেছেন, ‘সবাই যুদ্ধবিরতির জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এটা হলো সেই সম্মিলিত শক্তির ফল। তবে এটা ফিলিস্তিনে শান্তি আসার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ।’ সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান লিন্ডে বলেছেন, ‘এটা ভালো খবর। এখন গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছানো সবচেয়ে জরুরি কাজ। তারপর শান্তি আলোচনা করতে হবে।’