করোনা মহামারীর কারণে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে ৩৯ শতাংশ। নতুন করে বিনিয়োগ না হওয়ায় মেশিনারিজ আমদানি কমেছে ৩৫ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির ১৭ শতাংশ পুরোপুরি বেকার হয়ে গেছে। এর প্রভাবে ৬০ শতাংশ মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চরম দুরবস্থায় রয়েছে ১ কোটিরও অধিক পরিবার। চাকরি বা কর্ম হারিয়ে বেসরকারি খাতের লোকজন এখন চরম দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবছর আবার ২৩ লাখ নতুন শ্রমশক্তি চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের মোট কর্মশক্তির ৯৫ শতাংশের এই খাতের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ সবাইকে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া। আর এজন্য আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন স্কিম চালু করার প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
আগামী ৩ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন।
করোনা মহামারীতে বেসরকারি খাতে কর্মরতরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ কোনো তথ্যভাণ্ডার (ডেটাবেজ) না থাকায় তাদের কাছে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) জরিপ বলছে, করোনায় দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ। গত বছর ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ বস্তিবাসী শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়, যাদের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এখনো ফেরেনি। দেশে চরম দরিদ্রের হার ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের সবাই বেসরকারি খাতে বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করত। করোনার শুরুতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু তার সিংগভাগই গেছে বড় শিল্পে। অথচ শ্রমশক্তির ৯০ ভাগের জোগান দেওয়া ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্পে যে সামান্য বরাদ্দ ছিল তাও ঠিকমতো পৌঁছায়নি। দেশে মোট প্রাতিষ্ঠানিক বেসরকারি খাত রয়েছে ৪৪টি। এর মধ্যে ৬টির ন্যূনতম মজুরি বোর্ড আছে, মেয়াদোত্তীর্ণ আরও ৬টির কাজ চলমান। বাকি ৩২টির কোনো বোর্ড নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে মোট কী পরিমাণ শ্রমিক কাজ করে তার সঠিক তথ্য কোনো সংস্থার কাছে নেই। এ বিষয়ে কখনো কোনো সুনির্দিষ্ট জরিপও হয়নি। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মোট শ্রমশক্তির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ৫ কোটি ১৭ লাখ। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ১ কোটিরও বেশি শ্রমশক্তি কাজ করে। এসবের মধ্যে কেবল পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে তেমন শ্রম আইন মানা হয় না।
এসএমই ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে জিডিপিতে শিল্পের অবদান ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে এসএমইএ খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। আর করোনা মহামারীর কারণে এই এসএমইএ খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত মিলে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ কাজ করে। করোনা মোকাবিলায় সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছে এই খাত তা সবচেয়ে কম পেয়েছে।
বেসরকারি পেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রাইভেট এমপ্লয়িজ ফোরাম (বিপিইএফ) গতকাল শনিবার ‘প্রাইভেট সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট এমিড কভিড-১৯ : এক্সপেকটেশন ফর বাজেট এফওয়াই-২২’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সেমিনারের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন বিপিইএফ আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সরকার জিডিপি নিয়েই পড়ে আছে, যা ধরাও যায় না ছোঁয়াও যায় না। ২ হাজার ২০০ ডলার মাথাপিছু আয় অথচ আরও গরিব হচ্ছি। আমাদের কভিডের ওপর ফোকাস করেই বাজেট করতে হবে। কভিড দূর করতে হলে ভ্যাকসিন দিতে হবে। সরকারকে দুটো ওয়েভের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এটা ভারতের মতো হবে কি না সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এজন্য স্বাস্থ্য খাতে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি করতে হবে। এসএমই খাতে আরও টাকা দিতে হবে। ব্যাংক লোন দিয়ে যেন দেউলিয়া না হয় সরকারকে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। দায়ভার শুধু ব্যাংকের ঘাড়ে রাখা যাবে না।’ দুরবস্থায় থাকা এক কোটি পরিবারকে মাসে দুই হাজার টাকা করে বাজেটে এক বছরের জন্য ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার দাবি জানান তিনি।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন ফান্ডের বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো কোনো পেনশন ফান্ড চালু হয়নি। সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে থেকে যেটা নিচ্ছে সেটা খরচ করে ফেলছে। কম করে হলেও ২৪-২৫ লাখ কোটি টাকার লায়াবেলেটিস সরকারের ঘাড়ে। এই টাকা ফেরত দিতে হবে। এখন থেকে একটা সিস্টেম চালু করলে ৩০ বছর পর একটা ফুল ফান্ড চালু হবে।’
দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সিং স্কিম জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সর্বোচ্চ ৫ বছরের ফিন্যান্সিং স্কিম আছে। কোনো ব্যাংক পদ্মা সেতু বা বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারবে না। কারণ সেগুলো ২০-৩০ বছরের প্রকল্প। পেনশন ফান্ড সৃষ্টি হলে এগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা যাবে। সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ফিন্যান্সিং স্কিম চালু করতে হবে।’
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টারগেশন ফর ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ বলেন, ‘প্রতি বছর ৩৩ লাখ নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে। এর মধ্যে থেকে ২৩ লাখ লেবার ফোর্স হিসেবে আসছে। কিছু শিশু হয়তো মারা যায়। কিন্তু বাকিরা কর্মক্ষেত্রে আসছে না। যারা আসছে তাদের বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। জিডিপির বাইরে কীভাবে চিন্তা করতে পারি, ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে চিন্তা করতে পারি সে বিষয়ে ভাবতে হবে। সরকার করোনাকালে যেসব প্রণোদনা দিয়েছে তা অনেকটা লোন বেইজ। এটাও কতটুকু পেয়েছে তা ফলো করা হয় না। যারা পেল না তারা ঠিক কী কারণে পেল না তাও জানা যায় না। কারণ কোনো ড্যাসবোর্ড নেই। সরকার যদি কোনো সাহায্য দিতে চায় তাও পারছে না। কারণ কোনো ডেটাবেজ নেই। এই তথ্যভাণ্ডার না থাকা আমাদের একটি বড় গ্যাপ। করোনা শুরুর এক বছর পরও যদি আমরা বলি আমাদের ডেটাবেজ নেই এটা দুঃখজনক। আমাদের তথ্যপ্রাপ্তি অনেক সীমিত।’
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, গত বছর থেকে প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। তারা সবাই বেসরকারি খাতের। এটা মোট কর্মঘণ্টার ১৭ শতাংশ। সরকার যদি প্রণোদনা না দিত তাহলে এটা আরও অনেক বেড়ে যেত। করোনার আগেই পোশাক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কমে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৬ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থান হারিয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলেছে, ২৭ লাখ চাকরিজীবী তাদের চাকরি হারিয়েছে। তারা সবাই বেসরকারি খাতের। ৩৬ শতাংশ মেশিনারিজ আমদানি কমেছে, ৩৯ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। সরকার আগে যে প্রণোদনা দিয়েছিল সেখানে এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিট বলতে কিছু ছিল না। এবারের বাজেটে সরকার এটাকে যুক্ত করতে পারে। সরকারকে আরেকটা প্রণোদনা প্যাকেজ দিতেই হবে, সেটা যে নামেই হোক না কেন।
অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের মোট চাকরিজীবীর ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে কাজ করেন। অথচ তৈরি পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত আমরা কাঠামোয় আনতে পারিনি। আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি সেখানে অনেকেই ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করে না। অথচ সরকারি বিজ্ঞাপন নিতে হলে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের চাকরি বিধিমালা নেই, কিন্তু শ্রম আইন আছে। বর্তমানে যেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি তা হলো, আমাদের টিকা দিতে হবে। তাহলে কর্মপরিবেশ ফিরে আসবে। পোশাক খাতের মতো অন্য খাতগুলোতেও প্রণোদনা দিতে হবে।’
দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) সভাপতি এমএইচ খসরু বলেন, ‘এসএমইদের ফোকাস না করে সবাই বড়দের নিয়ে ভাবে। অবশ্যই আমরা তাদের নিয়ে ভাবব। কিন্তু এসএমইকে প্রাধান্য দিতে হবে। চায়নায় ঘরে ঘরে কারখানা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের কেবল চাকরিজীবী নয়, উদ্যোক্তাও বানাতে হবে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতে আমরা গত বছর যে বরাদ্দ করলাম তার ৩০ শতাংশ খরচ করতে পেরেছে। এটা ব্যয় করতে হবে। ট্যাক্স সহজ করে দিতে হবে যাতে সবাই ট্যাক্স দেয়।’
তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘করোনায় আমাদের পোশাক খাতে ক্ষতি অনেক হলেও আক্রান্ত হার দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও করোনার শুরুতে ৬০-৭০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তবে পরবর্তীকালে তারা আবার কর্মস্থলে বা অন্য কোথাও যোগ দিয়েছেন। এখন আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আমাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া ছোট কারখানাগুলো চালু করতে ৫ মিলিয়ন ডলারের একটা সহায়তা ছিল, সেটাকে ১০ মিলিয়ন করা যেতে পারে। বিশ্বে এখন কৃত্রিম সুতার চাহিদা ৭০ শতাংশ আর কটন ৩০ শতাংশ। কটনের দামও অনেক চড়া। পণ্যের ভ্যালু অ্যাড করতে কৃত্রিম সুতা উৎপাদনে সহায়তা করা যেতে পারে।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি রেজওয়ান রহমান বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী একটা প্রস্তাব করেছিলেন ভলান্টিয়ারি পেনশনের। এটার জন্য একটা আইন প্রয়োজন। আইন তো সব জায়গায় আছে। কিন্তু কতখানি আইনের আওতায় আনা যায় এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। গার্মেন্টস সেক্টরকে সহায়তা করায় এখন ৫০ বিলিয়ন দেওয়ার সক্ষমতা হয়েছে। অন্য খাতগুলোকে বাছাই করে সহায়তা করলে সেখান থেকেও ৫০ বিলিয়ন রপ্তানি পাওয়া যাবে।’
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘দেশে ৪৩টা প্রাতিষ্ঠানিক শ্রম খাত আছে। এর মধ্যে ৩২টির কোনো মজুরি বোর্ড গঠিত হচ্ছে না। দেশে পর্যটন খাতে প্রায় ৫ লাখ, পরিবহন খাতে ৭০ লাখ, সেলুনে ১২-১৩ লাখ মানুষ কাজ করে। করোনাকালে এরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। এদের নিয়ে বাজেটে ভাবা দরকার। দেশের সব শ্রমশক্তির রেজিস্ট্রেশন থাকা প্রয়োজন। দেশে জিডিপি বাড়ছে, সে অনুযায়ী বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না সেটা দেখা প্রয়োজন।’