শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও মানসম্পন্ন ব্যয় চাই

মহামারীর মধ্যে প্রায় ১৪ মাস বন্ধ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যা দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় রেকর্ড। এর মধ্যে নানা কায়দায় শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলেও তেমন কাজে আসেনি বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিপরীতে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ঝরেপড়া, পড়াশোনার অনাগ্রহ, হতাশা বৃদ্ধিসহ নানা সংকটে পড়েছে দেশের শিক্ষা খাত। এ পরিস্থিতিকে ‘প্রজন্ম বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থায় মহামারী যে ক্ষতি করে গেছে তা কাটিয়ে উঠতে আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবাজেটে ২০-২৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। জ্ঞানমুখী ও অনুসন্ধিৎসু শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পাঠ্যপুস্তক এবং মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ওপর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত সরকারি সূত্র বলছে, প্রতি বছর শিক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটারই গুণগত ব্যয় হচ্ছে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন শিক্ষা বাজেট বাংলাদেশে : জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষা বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ২০ শতাংশ হওয়া জরুরি। জিডিপির আকারে যা হবে ৬ শতাংশ। বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে এ বরাদ্দের পরিমাণ ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার কথা জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

২০১৮ সালে বিশ্ব ব্যাংক জানায়, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ তালিকায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সবার তলানিতে। এ হিসাবে ভুটান তাদের জিডিপির ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, নেপাল ৫ দশমিক ২ শতাংশ, আফগানিস্তান ৪ দশমিক ১ শতাংশ, মালদ্বীপ ৪ দশমিক ১ শতাংশ, ভারত ৩ দশমিক শূন্য শতাংশ, পাকিস্তান ২ দশমিক ৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ২ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষায় বিনিয়োগ করে। জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সরকারের পরিকল্পনা কমিশন। এ কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, শিক্ষায় বরাদ্দের কমতি আছে এ কথা সত্যি। তবে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে সেটাই পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেটুকু হচ্ছে তাও গুণগত ও দুর্নীতিমুক্তভাবে হচ্ছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্বাধীন। শিক্ষার উন্নয়নে তারা গবেষণা করছে না। গবেষণা করে যেখানে ব্যয় করা উচিত সেখানে করুক। তখন বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে সরকার অবশ্যই বাড়াবে। তারা কেন এটা করতে পারছে না এজন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

প্রজন্ম বিপর্যয় রক্ষার শিক্ষা বাজেট : করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত শিক্ষায় কেমন বাজেট হওয়া উচিত এ নিয়ে গত রবিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বরাবর ১৭টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযান। দেশ রূপান্তরের কাছে তার একটি অনুলিপি পাঠিয়েছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. রাশেদা কে চৌধুরী।

মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন মতবিনিময় সভার প্রস্তাবনা, এডুকেশন ওয়াচসহ অন্যান্য গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য, শিক্ষাবিদদের নির্দেশনার ভিত্তিতে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০, রূপকল্প-২০৪১, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-এর সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষা বাজেট পেশ করতে হবে। আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। ঝরেপড়া ঠেকাতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার্থীদের মাসিক ২৫০ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা, স্কুল রি-ওপেনিং গাইডলাইন অনুসরণ করে ১০ শতাংশ অর্থ জেলা, উপজেলা ও বিদ্যালয় পর্যায়ে বরাদ্দ দিতে হবে।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিখন সামগ্রী নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। ইন্টারনেটভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে একটি করে আইসিটি ডিভাইস প্রদান করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাইবার অপটিক কেব্ল সংযোগ থাকলেও বিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছায়নি, এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শিক্ষা খাতে আইসিটি উন্নয়নে বরাদ্দ দিতে হবে।

মূল ধারার সব বিদ্যালয়ে স্কুল মিল চালুর জন্য বরাদ্দ দেওয়া, চর-হাওর ও উপকূলীয় এলাকার বিশেষ চাহিদা সামনে রাখে বরাদ্দ দিতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সফটওয়্যার প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বই ছাপানো, করোনাকালে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাতে মন সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ রেখে একজন শিক্ষককে মনোসামাজিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করা, এজন্য ল্যাবরেটরি, উপকরণসহ প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক নিয়োগ। শিক্ষা গবেষণার জন্য সরকারি-বেসরকারি দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া। শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর লক্ষ্যে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে করের আওতা বৃদ্ধি করা। রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, করোনা মহাসংকটে সারা পৃথিবীতেই পরিকল্পনা, কর্মসূচি এবং বাজেটে শিক্ষা গুরুত্ব পাচ্ছে না। শিক্ষাকে অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে আমরা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ বাড়ানোর জোর : শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো পাঠ্যপুস্তক ও কারিকুলাম। বর্তমানে দেশে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যে পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হচ্ছে তা মানসম্মত নয় উল্লেখ করে এর আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, ২০১০ সালে শিক্ষানীতি করেও শিক্ষার উন্নয়ন ঘটানো যায়নি। জিপিএ পাঁচ নির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিলে শক্তিশালী জাতি গঠন দুরাশা। এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তক তৈরিতে বারবার ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে। এজন্য এ খাতে বড় বিনিয়োগ দরকার। বাজেটে এই দিকটি লক্ষ রাখতে হবে।

জ্ঞানমুখী ও অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেন এ শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, নিজ ভাষায় শিক্ষা ছাড়া জ্ঞাননির্ভর জাতি তৈরি সম্ভব নয়। এজন্য বাংলা উন্নয়ন বোর্ড তৈরি করতে হবে। টেকনিক্যাল শিক্ষার ওপর বড় বাজেট দরকার। পঞ্চম শ্রেণির পর থেকে এ শিক্ষা দিতে হবে। এসএসসির পর ব্যাপক হারে দিতে হবে। যাতে এরপর যে কেউ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এইচএসসির পর কিছুসংখ্যক উচ্চশিক্ষা নেবে। সবার নেওয়ার দরকার নেই। বিশ্বায়নের জন্য যোগ্য কর্মী গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগে আলাদা ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, চীনা ও আরবিসহ গুরত্বপূর্ণ ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দেন। এজন্য বাজেটে বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামসুদ্দিন মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৫ ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের। বাজেটে তাদের জন্য খাতা-কলম, স্কুলের পোশাক, স্কুল ফিডিংয়ের বরাদ্দ থাকা জরুরি। বাংলাদেশ বেসরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি এনামুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা খাতে বর্তমানে যা হচ্ছে সবটাই অবকাঠামো উন্নয়ন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারও উন্নতি হচ্ছে না। সরকার শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কিন্তু বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাবরেটরি নেই। ফলে এ প্রশিক্ষণ কাজে লাগছে না। সর্বোপরি লেকচার মেথড থেকে বের হয়ে আমাদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা পদ্ধতিতে যেতে হবে।