অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ল্যান্ডফল প্রক্রিয়া শেষ। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে ল্যান্ডফল। দূরত্বের জেরে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব থেকে বেঁচে গেছে কলকাতা। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা সঞ্জীব ব্যানার্জি জানিয়েছেন, ক্রমশ শক্তি হারাবে প্রবল শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। তবে ইয়াসের জেরে কলকাতাসহ সংলগ্ন জেলাগুলোতে বৃষ্টি চলবে।
মূলত ভারতের ওড়িশা রাজ্যের উত্তরের উপকূলে আঘাত হানার পর দুর্বল হয়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। গতকাল বুধবার বেলা দেড়টার দিকে এটি বালাসোর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছিল। তখন বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার। সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি রাজ্যের উপকূলীয় এলাকা বালাসোর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার। সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার।
ইয়াসের প্রভাবে ওড়িশায় অন্তত দুজন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া অন্তত ১০ লাখ মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে। ওড়িশার কেওনঝড় জেলার পঞ্চপল্লী গ্রামে গাছের নিচে চাপা পড়ে একজন মারা গেছেন। স্থানীয় কর্মকর্তা সরোজ কুমার দত্ত এ তথ্য জানিয়েছেন। রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ জেলার জগন্নাথ খুন্তা গ্রামের একটি পুকুর থেকে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করেছে জাতীয় দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া বাহিনী।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে কমপক্ষে দুজন মারা গেছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, ভবন ধসে একজন মারা গেছেন। আরেকজন সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন। বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের খবরে বলা হয়েছে, এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন দুজন। আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকেই দিঘায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতাও বেড়ে চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতাও বেড়েছে। সেই সঙ্গে দিঘা ও নিউ দিঘায় গার্ডরেল ছাপিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এর ফলে বুধবার সকালেই জলমগ্ন হয়ে গেছে দিঘার মূল শহর। এমনকি জলমগ্ন দিঘা থানাও। দিঘার বাজার এলাকা ৫ থেকে ৬ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। কলকাতায় জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ। কলকাতা থেকে সাড়ে ১১ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে।
ইয়াসের দাপটে তছনছ অবস্থা দিঘার। সমুদ্রের প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। তীব্র গতিতে বইছে ঝড়ো হাওয়া। উত্তাল সমুদ্রের জল গার্ডওয়াল টপকে ঢুকছে রাস্তায়। রাস্তা টপকে হোটেলেও ঢুকেছে জল। ডুবে গেছে সমুদ্রসংলগ্ন দোকানগুলোও। প্লাবিত মন্দারমণি, তাজপুরও। ডুবে যায় রাস্তার ওপর দাঁড় করানো গাড়ি। এই অবস্থায় সমুদ্র তীরবর্তী ও লোকালয়ে সেনা নামিয়ে চলছে উদ্ধারকাজ। মন্দারমণিতে বীভৎস প্রভাব পড়েছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের। অধিকাংশ হোটেলগুলোতে জল ঢুকেছে। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত গ্রাম। তীব্র ঝড়ো হাওয়ায় উড়ে যায় বাড়ির চাল, লোকালয়। বিপর্যয় মোকাবিলা দল ও সেনা নামিয়ে চলছে উদ্ধারকাজ।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, ইয়াসের তাণ্ডবে বিভিন্ন জায়গায় গাছ উপড়ে পড়েছে। নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১৫টি বাঁধ ভেঙে গেছে। অপরদিকে পূর্ব মেদিনীপুরে ৫১টি বাঁধ ভেঙেছে। দিঘা থেকে অনেক লোককে সরানো হয়েছে। দেড় লাখ মানুষকে সেখান থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও লোকজনকেও সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। দিঘার জেলা প্রশাসক করোনা আক্রান্ত হয়েও সেখানে কাজ করে যাচ্ছেন।