রাজধানীর গুলশানের ভাড়া বাসা থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার হওয়ার এক মাস পর ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তোপের মুখে পড়েছেন এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলার বাদী মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়াসহ আয়োজকরা। গতকাল বুধবার ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কেন্দ্রীয় সংসদ’ নামে দুটি সংগঠনের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিতর্কিত একজন আইনজীবী ও নুসরাতসহ কয়েকজন বক্তব্য রাখেন। পরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে তারা একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে যান। সংবাদ সম্মেলনে তারা গুলশান থানায় পুলিশের মামলা রেকর্ড ও মামলার তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তাদের সম্পর্কে বিষোদগার করেন। তারা বলেন, ঘটনাটি হত্যা। তাই আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা এখানে চলতে পারে না। এই মামলার তদন্তের এখতিয়ার পুলিশের নেই।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের একপর্যায়ে মুনিয়ার বড় বোন ও আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলার বাদী নুসরাত বলেন, মুনিয়া ছিল তার অবাধ্য। সে তার কথা শুনত না। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নবাণের মুখে তাদের দাবি থেকে সরে আসার কথাও জানান আয়োজকরা।
গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটি ও মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কেন্দ্রীয় সংসদ যৌথভাবে একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকে। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সভাপতি মেহেদী হাসান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম রেজার পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মুনিয়ার বড় বোন ও মামলার বাদী নুসরাত, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কেন্দ্রীয় সংসদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুব হাসান, অ্যাডভোকেট মাসুদ সালাউদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুল্লাহ মেজবাহ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কুমিল্লা মহানগরের সভাপতি আইরিন আহমেদ, ডেমরা ও কেরানীগঞ্জ সন্তান কমান্ডের সভাপতি মো. সামছুল আলম ও মো. ইকবাল। এ সময় মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ৫ দফা দাবি পেশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়, আপনারা লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ মামলা করলেন ‘আত্মহত্যার প্ররোচনার’। তাহলে আপনাদের মামলাটি আইনত অবৈধ নয় কিÑ এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট মাসুদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা থানায় যে এজাহার করেছি; আমার আইন পেশার ২০ বছরের জীবনে এত সুন্দর এজাহার কখনো দেখিনি। এর সবগুলো অক্ষরই সত্য। মামলার রেকর্ডিং অফিসার ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি রেকর্ড করেছেন ‘অন বায়াসড’ অবস্থায়। মামলাটি ভিন্নখাতে নেওয়া হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯/১ ধারা অনুযায়ী রেকর্ড করা উচিত ছিল। এটা ট্রাইব্যুনালের মামলা। ট্রাইব্যুনাল থেকে অনুমতি নিয়ে মামলাটি রেকর্ড করতে পারতেন থানার ওসি। তিনি যে মামলাটি তদন্ত করছেন; সেটারও কোনো অধিকার নেই তদন্ত কর্মকর্তার। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই মামলা তদন্ত করতে পারেন। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে প্রলোভন দেখালে; পরে বিয়ে করবে না বললে সেটা ধর্ষণ মামলা হবে। আর কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হবে না। এখানে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি আছে। এর ওপরে মামলার আসামির সাজা হবে। এখানে কোনো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দরকার নেই, কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তা দরকার নেই।’
সাংবাদিকরা পাল্টা প্রশ্ন করেন, তার মানে আপনার বক্তব্যে এটা প্রমাণ হয় যে, বাদী আত্মহত্যার প্ররোচনার যে মামলা করেছেন সেটা বেআইনি এবং এর আইনগত বৈধতা নেই। এ সময় ওই মামলার বাদী নুসরাতের উপস্থিতিতে ওই আইনজীবী একমত প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি (বাদী) এজাহার করেছেন। আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেননি। দারোগা সাহেব ভুল করলে আমাদের কিছু করার নেই। এছাড়া এজাহার অনুযায়ী মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (ক) ধারায়ও হতে পারত। সবকিছু ট্রাইব্যুনালে আসবে।’
মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজের আদালতে করা হত্যা মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘তার (মুনিয়া) ভাই কীভাবে মামলা করেছে সেটা আমাদের জানা নেই। কারণ তার ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের বিরোধ রয়েছে।’
নুসরাত যে বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছেন, সেই গাড়িটি কোথায় পেলেনÑ এ প্রশ্নের জবাব দেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সভাপতি মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে জানানো হবে। কারণ অনেক বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায় না।’
এ সময় নুসরাত বলেন, ‘আমি আপনাদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেব না। আপনারা কিছু মিডিয়া না জেনে অশালীন রিপোর্ট লিখছেন। আপনাদের কলমের সত্যতা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কি আত্মীয়স্বজন থাকতে পারে না? জাতীয় সংসদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, যিনি স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের পরিদর্শক হিসেবে কাজ করেন, তার নাম ওয়াহিদুজ্জামান শাকিল। তিনি আমাকে গাড়ি দিয়েছেন।’
গত ২৬ এপ্রিল রাতে বিলাসবহুল একটি পাজেরো জিপে (ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৭১১০) নুসরাত কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসেন এবং পরে গুলশান থানায় যান। জানা গেছে, ২০০৭ সালে কোরিয়ার এক নাগরিক বনানীর একটি ঠিকানা ব্যবহার করে ওই গাড়িটি কেনেন। ২০০৯ সালে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গাড়িটি কে ব্যবহার করছেন, সে তথ্য বিআরটিএ’র কাছে নেই। ২০১৯ সালে গাড়িটির রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০২০ সালে সর্বশেষ ট্যাক্স-টোকেন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলনে নুসরাতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খোঁজ নিয়ে স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চে ওয়াহিদুজ্জামান শাকিল নামে কোনো কর্মকর্তা থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইস্টওয়েস্ট মিডিয়ার গণমাধ্যমগুলোর লাইসেন্স বাতিল করার দাবি কেন করা হচ্ছে, জানতে চাইলে আয়োজকদের পক্ষে মেহেদী হাসান বলেন, ‘এটা আমাদের দাবি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে কারও শত্রু নই। আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করি। আমরা শুধু একটি দাবি করছি। আমরা আমাদের দাবিগুলো বলেছি।’ পরে একের পর এক প্রশ্নের একপর্যায়ে এ দাবি থেকে সরে আসেন তিনি।
কারও দ্বারা প্রভাবিত বা প্ররোচিত হয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে অপ্রাসঙ্গিকভাবে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবসায়িক বিষয় তুলে অন্য কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন কিনা, জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি আয়োজকরা।
প্রশ্নের একপর্যায়ে মামলার বাদী নুসরাত বলেন, ‘ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের দুই বছরের গ্যাপ আছে। ঘটনার দুই দিন পর একটি গাড়িতে দুজন ব্যক্তি আমাদের বাসায় যায়। তারা আমার ভাইয়ের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে কথা বলে। তাদের পরামর্শে কিছু করেছে কিনা জানি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুনিয়া পুরোপুরিভাবেই আমার অবাধ্য ছিল। সে আমার কথা শুনত না।’ অথচ ছোট বোন মুনিয়ার কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন নুসরাত। এমনকি মুনিয়ার মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও তার কাছে থেকে প্রায় এক লাখ টাকা নিয়ে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে একটি রেস্তোরাঁয় বিয়েবার্ষিকী পালন করেন তিনি।
টাকার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ : সংবাদ সম্মেলন শেষে টাকার ভাগাভাগি নিয়ে আয়োজকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় এক নারীকে বলতে শোনা যায়, যা কথা হয়েছিল আমরা তা পাইনি। আমাদেরকে বলা হয়েছিল মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এখন দেওয়া হলো ৫০০ টাকা। শুনেছি শারুন সাহেব (চট্টগ্রাম-১২ আসনের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন) আজকের সংবাদ সম্মেলনের জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন। অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে আমরাই বড় অন্যায়ের শিকার হলাম। এ সময় আয়োজকদের একজন বলেন, আমি যা পেয়েছি আপনাদের ভাগ করে দিয়েছি। আপনারা কি আমাকে বিশ্বাস করেন না।
গত ২৬ এপ্রিল গুলশানে মুনিয়ার বোন ও ভগ্নিপতির ভাড়া করা বাসা থেকে মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই গুলশান থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা হয়। ওই ঘটনার কয়েক দিন পর গত ২ মে মুনিয়ার বড় ভাই আশিকুর রহমান সবুজ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা মামলা করেন। দুটি মামলা মাথায় রেখে মুনিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।