করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে আগামী ১৩ জুন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। সে হিসাবে ১২ জুন পর্যন্ত চলমান ছুটি অব্যাহত থাকবে। স্কুল-কলেজ খোলার পর চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ৬০ দিন ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ৮৪ দিন ক্লাস নেওয়ার পর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। গত ১৪ মাস ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকবার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। তাদের পরীক্ষা আদৌ হবে কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। একই সময় দ্রুত প্রতিষ্ঠান চালু করা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আসেন দীপু মনি।
৬০ দিন এসএসসি, ৮৪ দিন এইচএসসির ক্লাস : আগামী দুই মাসের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে কতদিন কোন শ্রেণির ক্লাস এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ক্লাস ও পরীক্ষার বিষয়ে আমরা ভাবছি। আপাতত আমাদের মূল পরিকল্পনা ১৩ জুন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া। খুব বেশি প্রতিকূল পরিস্থিতি না থাকলে আমরা ১৩ জুন থেকেই খুলে দিতে চাই। এখন যে পরিস্থিতি আছে, সেটা দেখে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে চাই। পরিস্থিতি যদি অনুকূলে না থাকে, তাহলে হয়তো ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
তবে আলাদাভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা নেই জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কোথাও কোথাও বন্ধ রাখা, কোথাও খুলে দেওয়াÑ এটাও বলছেন অনেকে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কোথাও খুলব, কোথাও খুলব না; সে ক্ষেত্রে অসাম্য আরও বেশি তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন আমরা খুলে দেব, তখন প্রথমে যারা ২০২১ সালে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে, তারা ছয় দিনই ক্লাস করবে। যারা ২০২২ সালে এসএসসি ও এইচএসসি দেবে, তাদেরও সপ্তাহে ছয় দিনই ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করব। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রথমে সপ্তাহে এক দিন করে ক্লাস করবে। প্রথমে আমরা দেখব কত দ্রুততার সঙ্গে তাদের ক্লাসটা এক দিন থেকে সময়টা বাড়ানো যায়। এরপর ক্রমাগত বাড়িয়ে দুই, তিন, চার দিন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে পূর্ণাঙ্গভাবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চলবে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ৬০ কর্মদিবস ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ৮৪ কর্মদিবস ক্লাস নেওয়ার দুই সপ্তাহ পর পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ক্লাস শুরুর পর জানিয়ে দেওয়া হবে।
ক্লাসে ফেরাতে না পারলে অ্যাসাইনমেন্টে জেএসসির ফল : ১২ জুন পর্যন্ত ছুটি বাড়ানোর বিষয়ে দীপু মনি বলেন, ‘আমাদের যে পরিস্থিতি আছে মহামারীর, তার সঙ্গে সম্প্রতি ঈদযাত্রার কারণে কিছুটা সংক্রমণের হার বেড়েছে। কোনো কোনো জেলায় সংক্রমণের হার বেশ বেড়েছে। সে কারণে সব বিষয় বিবেচনা করেই ১২ জুন পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে।’
এ সময় তিনি জানান, জেএসসি পরীক্ষার বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘জেএসসির ব্যাপারে আমরা ভাবছি অ্যাসাইনমেন্টের ভিত্তিতে যদি এটা করা সম্ভব হয়, সেটি আমরা দেখব। পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলে সেদিকে আমরা যাব। তা না হলে অ্যাসাইনমেন্টের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করব।’
টিকার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় খোলা : বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের টিকাদান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে দীপু মনি বলেন, ‘আবাসিক হলগুলোতে অনেক ভিড় আছে, আমরা সেটি দেখছি। টিকা দেওয়ার ব্যাপারে আমরা তথ্যগুলো চেয়েছি ইউজিসির মাধ্যমে, কতজন টিকা পেয়েছে। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ৪০ বছরের নিচে। তাই আমরা ধরেই নিয়েছি তাদের অধিকাংশেরই টিকা দিতে হবে এবং কাজটি আমরা দ্রুত শুরু করতে পারব। প্রথম ডোজ দিলেই তো হবে না, দ্বিতীয় ডোজও দিতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের আরেকটু চিন্তা করতে হচ্ছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার সিদ্ধান্ত এ টিকার ওপর খানিকটা নির্ভর করবে বলে জানান তিনি।
২ লাখ শিক্ষককে মানসিক প্রশিক্ষণ : করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় ভুগছে উল্লেখ করে দুই লাখ শিক্ষককে মানসিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘স্কুল খোলার পর তারা শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও মানসিক বিভিন্ন বিষয় দেখে প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং করবেন। করোনার মধ্যে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা নানা ধরনের ডিভাইস, গেমের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। স্কুল-কলেজ খুললে তাদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা থেকে যেতে পারে। তাই বিষয়টি আমরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।’
স্কুল পরীক্ষাও হবে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে : এ বছর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে কি নাÑ জানতে চাইলে দীপু মনি বলেন, ‘বার্ষিক পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে নেওয়া হবে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরির কাজ চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর আমরা তা জানিয়ে দেব। যদি ১৩ জুন স্কুল-কলেজ খুলে দিতে পারি, সে ক্ষেত্রে ২০২১ সালের এসএসসি-এইচএসসি ব্যাচকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তারা হয়তো সপ্তাহের ছয় দিন ক্লাসে আসবে। যারা ২০২২ সালের এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থী, তাদের ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে ক্লাসে নিয়ে আসা হবে। অন্যদের সপ্তাহে হয়তো এক দিন ক্লাসে আনা হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন।