সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আটকে পড়া সৌদিপ্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরানোর জন্য স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত কিছু শর্তাবলি শিথিল করেছে সৌদি সরকার। ভিসা ও ইকামার মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশিদের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকার হোটেলের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। আগে সিদ্ধান্ত ছিল সৌদি সরকারের নির্দিষ্ট করা একটি মাত্র হোটেলেই কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। আর এখন সেই হোটেল সংখ্যা বাড়িয়ে ৫২টি করার ব্যাপারে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ইতিমধ্যে গেজেটও প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হোটেলসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তা ছাড়া জটিলতা নিরসনে কয়েক দিন ধরেই বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্তাব্যক্তিরা এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকও করে আসছেন।
এদিকে টিকিটের বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য আটকেপড়া প্রবাসীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ৩০ মে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এতে শিগগিরই নিরসন হতে চলছে আটকেপড়াদের জটিলতা। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এ ধরনের সফলতা এসেছে। এখন থেকে যাত্রীদের আর তেমন ভোগান্তির শিকার হতে হবে না বলে দাবি করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি সৌদির জুড়ে দেওয়া কঠিন শর্তগুলো শিথিল করতে। কয়েকটি শর্ত শিখিল করতে সৌদি সরকার ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। তারা বলছে, করোনার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতেই এসব শর্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মানবিক দিক বিবেচনা করে তারা কঠিন শর্তগুলো থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টিকিটের ব্যয় বাড়ানোয় সৌদি আরবগামী প্রায় সাড়ে ৬ হাজার আটকেপড়া যাত্রীর অনেকেই বিপাকে পড়েছেন। তাদের ফেরাতে সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন উল্লেখ করে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সৌদি সরকার করোনাসংক্রান্ত ‘বিধিনিষেধ’ জারির সঙ্গে বেশ কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করে; বিশেষ করে সৌদিতে পৌঁছার পর নিজ খরচে সেখানকার মানসম্মত হোটেলে কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে যাতে বাংলাদেশি টাকায় কমপক্ষে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার অতিরিক্ত লাগবে। অন্তত এই টাকা যদি সরকার আর্থিক হিসেবে প্রদান করে, তাহলে রেহাই পাবেন তারা।
সূত্র আরও জানায়, শিথিল করা কয়েকটি শর্তের মধ্যে রয়েছে অনাবাসিক এবং প্রথমবারের জন্য দর্শনার্থী যারা করোনা টিকার উভয় ডোজ নেওয়ার ১৪ দিন পার করেছেন, তাদের সৌদিতে পৌঁছে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে না বলে জানিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বিমান এসংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোয়ারেন্টাইনে না থাকতে যাত্রার সময় অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে টিকা নেওয়ার প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। এ ছাড়া আবাসিক বা আকামা ধারক, যারা সৌদি আরব থেকে তাওয়াকল্লা অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করে করোনার প্রথম বা দ্বিতীয় (উভয় বা যেকোনো একটি) টিকা নিয়েছেন এবং যাদের অবস্থান অ্যাপে উল্লেখ আছে, তাদের সৌদি আরবে গিয়ে কোয়ারেন্টাইন থাকতে হবে না। তা ছাড়া বিমানের জেদ্দা, রিয়াদ ও দাম্মামগামী যাত্রীদের যাত্রা শুরুর কমপক্ষে ৭২ ঘন্টা আগে কোয়ারেন্টাইন হোটেলসহ প্যাকেজ নিশ্চিত করতে হবে। বিমান হলিডে ব্যতীত অন্য কোনো মাধ্যমে হোটেল বুকিং গ্রহণযোগ্য হবে না। টিকিট ও কোয়ারেন্টাইন প্যাকেজ নিশ্চিত হওয়ার পর যাত্রীদের সৌদি আরবে অবতরণ করা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরটি পিসিআর পদ্ধতিতে করোনাভাইরাস পরীক্ষার নমুনা প্রদান ও রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
এ বিষয়ে বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘প্রবাসী কর্মীদের কথা চিন্তা করে ভিসা ও এক্সিট ভিসার মেয়াদ ২ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করেছেন সৌদি আরবের বাদশাহ। এর মাধ্যমে যেসব কর্মী ছুটিতে নিজ নিজ দেশে রয়েছেন কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সৌদিতে ফিরতে পারছেন না, তাদের সবাই এই সুবিধা পাবেন।’
অন্যদিকে গতকাল বুধবারও সৌদির টিকিট কাউন্টার ও রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীরা ভিড় করেছেন। এই সময়ে তাদের সামলাতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সৌদি আরবে যেতে না পারার আশঙ্কা থেকে কান্নাকাটি করতেও দেখা গেছে অনেককে। এখন আর হোটেল বুকিং দেবে না বলে এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আকামার মেয়াদ বাড়লেও সৌদিতে যেতে অনিশ্চয়তা কাটছে না তাদের।